বিবৃতিঃ ২০২০ সাল আমার জন্য ভয়াবহ প্যাঁড়াদায়ক ছিলো। এটা নিয়ে একটা ব্লগ পোস্ট না লিখলেই নয়। আরও আগেই লেখা উচিৎ ছিল। কিন্তু ‘করছি, করবো’ বলে হাজারো কাজের মত এটাও আটকে ছিল। আজ ‘তোর একদিন কি আমার একদিন’ বলে লিখেই ফেললাম! পড়লে পাঠকেরা বুঝতে পারবেন একজনের জীবনে দুঃখ আর সুখ কীভাবে পাশাপাশি চলে। কীভাবে আশাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশাল ফাঁপরে পড়েছিলাম। স্প্রিং ব্রেকে (মার্চ ২০২০) ঘুরতে গিয়েছিলাম লাস ভেগাসে, আসার পর শুনি ভার্সিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। সে বন্ধ আর খুললো না। আমি বন্ধের মধ্যে অনলাইনে ক্লাস করে, অনলাইনেই থিসিস ডিফেন্ড করে ২০২০ সালের মে মাসে মাস্টার্স পাশ করে ফেললাম। এরপর শুরু হলো চাকরির জন্য অনিশ্চয়তা। কোভিড-১৯ এর কারণে চাকরির বাজারে ধ্বস নেমেছে। আমেরিকানরাই যেখানে চাকরি হারাচ্ছে, আমার মত বহিরাগত কীভাবে চাকরি পাবে? এদিকে আমার Optional practical training (OPT)-এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে সেপ্টেম্বরের ষোল তারিখে। তারমানে ততদিন বৈধভাবে আমেরিকায় থাকতে পারব। এর মধ্যে চাকরি না জুটলে দেশে ফেরত যেতে হবে। হিসেব করে দেখলাম বিমানের টিকেট কেনার জন্য ব্যাংকে টায় টায় টাকা আছে। সেটা আগলে রাখলাম।
মে মাসে গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার পর থেকে দিন গুনছি সেপ্টেম্বরের ষোল তারিখ আসতে কত দেরি। ডিপার্টমেন্টের কোনো প্রফেসরকেই নক দিতে বাদ রাখিনি চাকরির জন্য, কেউ যদি আমাকে কারো কাছে রেকোমেন্ড করতে পারেন! কেউই তেমন সাহায্য করতে পারলেন না। এই দেশে রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান না হলে পুষ্টিতে পড়াশোনা করে বিদেশী শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়া যে কতো কঠিন, তখনই বুঝেছি। তাছাড়া কোভিড-১৯ এর কারণে খুচরো খাচরা যেসব চাকরি আমি পেতে পারতাম, সেগুলোর রাস্তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। বুঝতেই পারছেন কেমন বিপাকে পড়েছিলাম! মানুষজনকে অনুরোধ করার সাথে সাথে নিজের খোঁজাখুঁজি তো ছিলই। চাকরি খোঁজার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে (Indeed, LinkedIn, Glassdoor, Monster, ZipRecruiter) সিভি আপলোড করে রেখেছি, যদি কারো চাহিদার সাথে আমার প্রোফাইল মিলে যায়! তাছাড়া খুব বেছে বেছে আবেদন করেছি পনেরো-বিশটা কোম্পানিতে। একধারচে আবেদন করিনি কারণ তাতে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা যে বেড়ে যায়, তা নয়। বরং আপনার অভিজ্ঞতা-পড়াশোনা-আগ্রহ ইত্যাদির সাথে চাকরির বর্ণনা ৯০% মিলে গেলে আবেদন করা ভালো। এতে ইন্টার্ভিউয়ের ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাছাড়া কেউ যদি নির্বাচন কমিটির কাছে আপনাকে সুপারিশ করে, সেটাও ইন্টার্ভিউয়ের ডাক পেতে সাহায্য করে। আমার তো আর সব জায়গায় কানেকশন (দেশে যাকে বলে ‘চ্যানেল’) ছিলো না। তাই অনেক জায়গায়ই আবেদন জমা দিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার ছিলো না। যেসব জায়গায় আমার পরিচিত মানুষজন চাকরি করতো, একজনকেও মনে হয় বাদ রাখিনি নক দেওয়ার। সবাইকে সিভি পাঠিয়ে বলতাম, চাকরির সুযোগ থাকলে যেন আমাকে জানায়। দুই, একজন জানিয়েছিলো। কিন্তু সেসব জায়গায় যখন আবেদন করলাম, উত্তর এলো, “কোভিড-১৯ এর কারণে কর্মী নিয়োগ দেওয়া বন্ধ আছে। আপনাকে আমরা সম্ভাব্য তালিকায় রাখছি। রিক্রুটিং শুরু হলে যোগাযোগ করা হবে।” উত্তরগুলো পড়ে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যেত কিন্তু কান্না আসতো না। আমি তখন অধিক শোকে পাথর অবস্থায় আছি। মাথার উপর দেশে ফেরত যাওয়ার চিন্তা এমনভাবে চড়াও হয়ে ছিল যে, অন্য চিন্তাগুলো কাবু করতে পারতো না। এমন অবস্থায় যেসব জায়গায় নিজে নিজে আবেদন করেছিলাম, সেগুলোর মধ্যে একটা থেকে ইন্টার্ভিউয়ের ডাক এলো। দিলাম ইন্টার্ভিউ। চাকরিটা সেন্ট লুইস শহরেই, যেখানে থাকি। একটা কিচেনের ম্যানেজার পদে চাকরি। যেহেতু দুই বছর সেন্ট লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কিচেনে আমি সাহায্যকারী হিসেবে চাকরি করেছি, সে অভিজ্ঞতা দেখিয়ে ভেবেছিলাম চাকরিটা পেয়ে যাবো। কিন্তু কিছুদিন বাদে ওরা কল দিয়ে বললো, আমাকে নিতে পারছে না। আরেক প্রার্থী নাকি আমার চেয়েও বেশি অভিজ্ঞ! তাকেই নেওয়া হচ্ছে।
এভাবে একের পর এক নেতিবাচক কথা শুনতে শুনতে মনে হল, শহরে আর নয়। এবার আবেদন করব গ্রামে গঞ্জে। শহরে প্রতিযোগিতা বেশি। গ্রামে একটু কম হতে পারে। ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম পুষ্টি থেকে পাশ করা একজনের জন্য গ্রামের দিকে কোন ধরনের চাকরি আছে। সবচেয়ে বেশি দেখলাম WIC (Women, Infant and Children/উইক) নামের এক সরকারী প্রোগ্রামের চাকরি। এরা নিউট্রিশনিস্ট বা পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেয়। এই পদের জন্য রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান না হলেও চলে। দেখে তো আমার পোয়াবারো! তড়িঘড়ি সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে WIC প্রোগ্রামে যতো পুষ্টিবিদের পদ খালি আছে, সবগুলোতে আবেদন করা শুরু করলাম। এই প্রোগ্রামের কথা মাস্টার্স করার সময়েই শুনেছিলাম। ডায়েটেটিক ইন্টার্নশিপ করার সময় ‘মা ও শিশু’ ক্যাটাগরিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য ইন্টার্নরা কয়েক সপ্তাহের জন্য উইকে যেত। আমার যেহেতু অনেক ইন্টার্ন বন্ধুবান্ধব ছিল, ওদের কাছ থেকে উইকের গল্প শুনতাম। শুনে শুনেই প্রোগ্রামের প্রতি হালকা বিরক্তি চলে এসেছিলো। একে তো বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে, তার উপর করতে হবে মানুষের সাথে মেলামেশা। আমি অন্তর্মুখী মানুষ। দেওয়ালে পিঠ না ঠেকা পর্যন্ত যেচে কথা বলা বা আলাপ চালিয়ে যাওয়ার মত নই। বুঝতেই পারতাম না এইসব চাকরি মানুষ করে কীভাবে। সেই উইকেই শেষ পর্যন্ত আবেদন করে ভাসিয়ে দিলাম। মিশিগান, ক্যালিফোর্নিয়া, পেন্সিল্ভেনিয়া, নিউ ইয়র্ক, অ্যারিজোনা, ইউটাহ – আপনি নাম বলুন, আমি আবেদন করেছি। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া আর নিউ ইয়র্কে যে হবে না, সেটা জানতাম। হাইফাই অঙ্গরাজ্য বলে কথা। ওরা হয়তো রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান ছাড়া নেয়ই না। কিন্তু মিশিগান, অ্যারিজোনা, ইউটাহ, কোনোটাই আমাকে প্রত্যুত্তর দিলো না। এত কষ্ট করে আবেদন করার পর চাকরিদাতাদের কাছ থেকে এমন বেহায়া আচরণ পেলে খারাপ লাগে। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর এমন আচরণ দেখেও কান্না আসেনি যে, কেঁদে হালকা হবো। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম বলে অত ভেঙে পড়িনি। গেলে দেশেই যাবো, আর তো কিছু নয়! দেশে গিয়ে আবার চেষ্টা করবো পিএইচডির জন্য আসতে। নতুবা আমেরিকান মাস্টার্স দেখিয়ে চাকরি পেতে চেষ্টা করব এনজিওগুলোতে। মা, বাবাকেও জানিয়ে রেখেছিলাম যেকোনো মুহূর্তে বিমানে চেপে বসতে পারি। উনারাও সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন।
জুন মাসের শেষ দিকে এক প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টার্ভিউয়ের ডাক এলো। পেন্সিল্ভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রতিষ্ঠান। যার সাথে ইন্টার্ভিউ হবে, তার নাম জানানো হলো। আমি দেরি না করে পুরো অন্তর্জাল ঘেঁটে ফেললাম ঐ নামে সার্চ দিয়ে। যেখান থেকে যা তথ্য পারি, যোগাড় করার চেষ্টা করলাম। সাক্ষাৎকারগ্রহীতা সম্পর্কে ধারণা থাকলে ইন্টার্ভিউয়ের সময় রিল্যাক্সড থাকা যায়। লিংকডইনে যখন নামটা লিখে সার্চ দিলাম, দেখি আমার দুই ক্লাসমেটের সাথে মিউচুয়াল কানেকশন। আর যায় কোথায়? দুইজনকেই নক দিয়ে ইন্টার্ভিউয়ের ব্যাপারে জানালাম। বললাম, পারলে যেন ঐ সাক্ষাৎকারগ্রহীতার কাছে ওরা আমাকে রেকোমেন্ড করে। দুইজনই লাফাতে লাফাতে রাজি হলো। যথাসময়ে ইন্টার্ভিউ দিলাম। মনে হলো ভালোই হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও রিজেকশন এলো। তবে এবার একটা মজার ব্যাপারও ঘটলো। রিজেকশন ইমেইলের মধ্যে লেখা, “বিভার অফিসের পুষ্টিবিদ পদের জন্য তোমাকে নির্বাচিত করা সম্ভব না হলেও বাটলার অফিসের পুষ্টিবিদ পদের জন্য তোমার আরেকটা ইন্টার্ভিউ নিতে চাই। তুমি কি রাজি?” রাজি না মানে? ওরা দশটা অফিসের জন্য আলাদা আলাদা দশটা ইন্টার্ভিউ নিতে চাইলে আমি সেটাতেও রাজি।
দ্বিতীয় ইন্টার্ভিউ নিতে নিতে জুলাইয়ের শেষ চলে এলো। সেপ্টেম্বর আসতে বেশিদিন নেই। এবার যদি ওরা রিজেক্ট করে তাহলে কী হবে ভাবতে পারছি না। অন্য কোথাও থেকেও ইন্টার্ভিউয়ের ডাক পাচ্ছি না। যা হোক, দ্বিতীয় ইন্টার্ভিউ ফাটিয়ে দিলাম। প্রথমবার দিয়ে আত্মবিশ্বাস চলে এসেছিলো। দ্বিতীয়বারে যখন প্রশ্ন কমন পড়লো, ধুমিয়ে উত্তর দিলাম। অফিস ম্যানেজার লিন্ডা বারবার জিজ্ঞেস করল, “দুইদিন পর পগারপার হয়ে যাবে না তো? এই গ্রামে তোমার মত তরুণ তুর্কি কেন পড়ে থাকবে?” বললাম, “আমাদের গ্রামই পছন্দ। শান্ত, নিরিবিলি। তাছাড়া আমরা প্রকৃতির কাছে থাকতে পছন্দ করি। দুই বছর শহরে থেকে দেখেছি। ভালো লাগে না।” ম্যানেজার আশ্বস্ত হতে না পেরে বলল, “আমাদের এখানে ডিস্কো ক্লাব নেই, নাইট ক্লাব নেই। তোমরা উইকএন্ডে কী করবে?” বললাম, “চিন্তা নিও না। আমরা উইকএন্ডে আশেপাশের অঞ্চলে ঘুরতে যাবো। আমাদের ক্লাব টাবের নেশা নেই।” তারপরও ম্যানেজারের সন্দেহ যায় না। বলল, “এখান থেকে পিটসবার্গ হল সবচেয়ে কাছের শহর। এক ঘণ্টা লাগে যেতে। ওখানে গিয়ে মৌজমাস্তি করতে পারো।” আমি হাসলাম, “তাহলে তো হয়েই গেলো।” বুঝলাম কেউ অজ পাড়াগাঁয়ে চাকরির জন্য যেতে চায় না। আমি সে সুযোগ কাজে লাগিয়েছি বলে আজ সাক্ষাৎকারের সুযোগ পেয়েছি।
কিছুদিন পর একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এলো। যদিও অচেনা নাম্বার থেকে কল এলে সেটা রিসিভ করি না, কিন্তু এখন করতে হচ্ছে। কোন রিক্রুটার কখন কল দেয়, তার ঠিক নেই। কল ধরতেই রাণী মুখার্জির মত হাস্কি ভয়েজের এক লোক বলল, “আমি অ্যাডাজিওর হিউম্যান রিসোর্স থেকে বলছি। তোমাকে বাটলারের পুষ্টিবিদ পদটা অফার করতে পেরে আমরা আনন্দিত। তুমি কি জয়েন করতে চাও?” আমি কয়েক মুহূর্ত আঁক করে রইলাম। অ্যাডাজিও… হিউম্যান রিসোর্স… সত্যি শুনছি তো? সত্যি এই ব্যাটা আমাকে চাকরি পাওয়ার সংবাদ জানানোর জন্য কল দিয়েছে? নাকি অন্যদের মত “দুঃখিত, এই মুহূর্তে অফার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না” বলতে গিয়ে ভুল করে অফার দিয়ে ফেলেছে? সত্যিই আমি চাকরি পেয়েছি? অ্যাঁ! মানুষ খুশিতে বাকরুদ্ধ হয়, আমি হয়ে গেলাম আবেগরুদ্ধ। মাথা কাজ করছে না, ব্যাটাকে কী বলবো সেটাও মাথায় আসছে না। আত্মবিশ্বাস এতটাই তলানিতে এসে ঠেকেছে যে, “হ্যাঁ, আমি জয়েন করবো” বলার আগেও প্রিন্সের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ মনে করলাম। বললাম, “দশটা মিনিট পরে সিদ্ধান্ত জানাই?” রাণী মুখার্জির পুরুষ সংস্করণ বলল, ‘অবিশ্যি!’
কল কাটার পর চোখ পিটপিট করে বুঝতে চাইলাম এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি। যখন বুঝলাম সত্যি, সারা শরীর কাঁপিয়ে কান্না চলে এলো। পড়ার টেবিলে বসে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলাম। সে কী কান্না! রিজেকশন লেটার পেয়েও এমন কান্না কাঁদিনি যেটা একসেপ্টেন্স কল পেয়ে কাঁদলাম। কান্নার দমক হালকা কমে এলে প্রিন্সকে কল দিলাম। ও বাসার বাইরে ছিল। আমার ফোঁপানি শুনে ভয় পেয়ে গেলো। ইউএসসিআইএস আজকেই দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে নাকি? যখন বললাম চাকরি পেয়ে গেছি, ও-ও আঁক করে উঠলো। তবে সামলে নিয়ে বলল, “ওয়াও! কনফার্ম করেছ?” ওর কণ্ঠে প্রচণ্ড আনন্দের আভাস। বললাম, “না। আগে তোমার সাথে কথা বলে নিতে চাচ্ছিলাম।” প্রিন্সের ঠ্যালা খেয়ে দশ মিনিট পার হওয়ার আগেই কল ব্যাক করে রাণী মুখার্জিকে বললাম, “আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলে গিয়েছিলাম। অসংখ্য ধন্যবাদ সুন্দর খবরটার জন্য। হ্যাঁ, আমি জয়েন করতে চাই।” লোকটা হা হা করে হেসে বললো, “হিউম্যান রিসোর্সে চাকরি করার এই এক মজা। জব অফারের কথা শুনে মানুষজনের প্রতিক্রিয়া দেখার সুযোগ হয়।”
এরপর আর কী? আগস্টের শেষে তল্পিতল্পা গুটিয়ে আমরা মিজৌরি থেকে পেন্সিল্ভেনিয়া চলে গেলাম। শেষ হল প্রচণ্ড আতংকের তিন মাস। যাওয়ার আগে আমার মাস্টার্স থিসিস সুপারভাইজর ডঃ জোন্সকে বললাম চাকরি পাওয়ার কথা। উনি উচ্ছ্বসিত হলেন ঠিকই কিন্তু এটাও বললেন, উইকের চাকরিতে ক্যারিয়ার নেই। যে পুষ্টিবিদ পদে ঢুকেছি, সম্ভাবনা আছে এখানেই সারাজীবন আটকে থাকবো। শুনে দমে গেলাম। এমনিতে মানুষের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক আমার মত একজন কীভাবে এই চাকরি করবে, সেটা বোধগম্য নয়। শুধুমাত্র desperate times call for desperate measures বলে আকালের সময় এই চাকরির জন্য আবেদন করা উপযুক্ত মনে হয়েছে। তার উপর যদি ক্যারিয়ারে উন্নতি করার কোনো সুযোগ না থাকে, কীসের প্রেষণায় চাকরি চালিয়ে যাবো? প্রিন্স সান্ত্বনা দিয়ে বলল এতকিছু ভেবে এখনই মন খারাপ করার দরকার নেই। এই দুঃসময়ে যে একটা চাকরির যোগাড় হয়েছে, এ-ই অনেক। চাকরিতে ঢুকার পর বাকি রাস্তা খুঁজে নিতে সমস্যা হবে না।
সে আশায় আশায়ই শুরু করেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে আমার দ্বিতীয় ইনিংস, ফুল টাইম চাকরি। এরপর শুরু হয়েছে তৃতীয় ইনিংস, পিএইচডি। জানি না এরপর কোথায় যাব, কী করবো। জীবনে সবকিছু এতোই অনিশ্চিত যে, আগে থেকে কিছু আশা করতে ভয় লাগে। তার মানে এই না, আমি হাল ছেড়ে দিই। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি লক্ষ্যে পৌঁছানোর, বাকিটা সম্ভাব্যতার উপর (সাদা বাংলায় যাকে মানুষ ভাগ্য বলে)। সবাই ভালো থাকুন, নিজ নিজ স্বপ্ন পূরণের জন্য স্মার্ট উপায়ে চেষ্টা করুন।