আমি মনে হয় সেইসব হাতেগোনা মানুষদের একজন যে ছোটবেলায় কোনো জিবলি মুভি দেখেনি, বড় হয়েও দেখার চেষ্টা করেনি; যে অনেক প্রশংসা শুনেছে জিবলি স্টুডিওর, কিন্তু কখনো আগ্রহ পায়নি সে স্টুডিও থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র দেখার। চার বছর আগে মানে ২০১৯ সালে হঠাৎ করে আমার ইচ্ছে হলো জিবলি মুভি দেখার। ২০১৮ সালে এরকম আচানকভাবেই হ্যারি পটার মুভি সিরিজ দেখার ইচ্ছে হয়েছিলো। প্রায় বারো বছর ধরে হ্যারি পটার ‘দেখবো দেখছি’ করে অবশেষে ২০১৮ সালে এসে আটটা মুভি একটানা দেখে কুফাটা ভেঙেছিলাম। ২০১৯ সালে প্রিন্সের সাথে কী নিয়ে যেন আলাপ করতে করতে জিবলির কথা উঠেছিলো। প্রিন্স জিজ্ঞেস করলো আমি জিবলির অমুক মুভিগুলো দেখেছি কিনা। আমি মাথা নেড়ে বললাম, “আমি জিবলির কোনো মুভিই দেখি নাই”। শুনে প্রিন্স এমনভাবে তাকালো যেন আমি এইমাত্র কাউকে খুন করে বাসায় ফিরেছি। তোতলাতে তোতলাতে বলল, “তুমি জিবলির কোনো মুভি দেখ নাই?” মিনমিন করে বললাম, “ইয়ে… না।” প্রিন্স কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে বলল, “আচ্ছা।” ওর প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল প্রচণ্ড দুঃখ পেয়েছে আমার কথায়। বললাম, “অনেক বছর ধরে দেখবো দেখবো করছি, দেখার আগ্রহ পাচ্ছি না। যদি দেখতে চাই, কোনটা দিয়ে শুরু করবো?” প্রিন্স দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মাই নেইবার ততোরো দিয়ে শুরু করতে পারো।” ওর মনে হয় বিশ্বাস হচ্ছে না আমি আসলেই দেখবো।
২০১৯ সালে আমার বয়স ছিলো বত্রিশ বছর। বাংলাদেশের মানুষ যেখানে মনে করে ‘কুড়িতে বুড়ি’, সে জায়গায় বত্রিশ বছর মানে এক পা কবরে দিয়ে রাখা। এই বয়সে এসে কি আমার জিবলির মুভি ভালো লাগবে? দোটানায় পড়ে গেলাম। দেখবো কি দেখবো না ঠিক করতে করতে কেটে গেলো কয়েকদিন। পরে খেয়াল হলো, আরে আমি তো বয়সের ধারই ধারি না! বয়স আমার কাছে একটা সংখ্যা ছাড়া কিছু না। তাই নিজেকে ‘বত্রিশ বছরের পরিপক্ক মনের মানুষ’ দাবী করাটা হাস্যকর। যারা আমাকে চেনে তারা জানে আমার টাকাপয়সা বানানোর খুব একটা ইচ্ছা নাই। দামী বাড়ি গাড়ি করারও ইচ্ছা নাই। শুধু মাথা গোঁজার একটা জায়গা আর এদিক সেদিক যাওয়ার একটা বাহন হলেই চলে। আমার মূল ইচ্ছা খানিক পয়সা জমিয়ে বিশ্বভ্রমণের জন্য বেরিয়ে পড়া। প্রিন্স আর আমি একই ক্যাটাগরির মানুষ। দুজনেরই চিন্তা হলো দুইদিনের দুনিয়ায় যদি পৃথিবীটা ঘুরতে না পারি, মরে শান্তি পাবো না। যা হোক, এতকিছু বলার কারণ হলো, জিবলি মুভি যদি কারো কাছে ‘ছোটদের মুভি’ হিসেবেও ট্যাগ খায়, তারপরও সেগুলো দেখতে আমার আপত্তি নেই। আমার মানসিকতাও ছোটদের মতই। বড়দের বৈষয়িক চিন্তাভাবনা আমাকে খুব একটা কাবু করতে পারে নাই। মু হা হা হা! তাছাড়া কাহিনী আর মেকিং ভালো হলে যেকোনো মুভি আমি দেখতে পারি। অনেকে তো বালছাল মার্কা বড়দের মুভিও দেখে (পড়ুন সুপারহিরো সম্পর্কিত কিছু আবর্জনা মুভি), তাই না? তাই “ভালো লাগলে লাগলো, না লাগলে নাই” ভেবে বসে পড়লাম ল্যাপটপের সামনে।
আমি জিবলির মুভিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম শুনেছি গ্রেইভ অফ দা ফায়ারফ্লাইস, স্পিরিটেড অ্যাওয়ে আর পোনিওর। বিশেষ করে গ্রেইভ অফ দা ফায়ারফ্লাইস মুভিটা আমার ছোটো ভাই আমাকে দেখতে বলেছিল সেই ২০১০-১১ সালের দিকে। তখন সে দেশ বিদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে শিখেছে। শেখার পর তার মুভি দেখার রুচি পাল্টে গেছে। চানাচুর মার্কা মুভি থেকে সে ভারিক্কী চালের মুভির দিকে ঝুঁকেছে। অথচ আমি তখনও হালকা চালের রোমান্টিক কমেডিতে বুঁদ হয়ে আছি। পরিপক্ক স্বাদের মুভি দেখার ইচ্ছে আমার অনেক পরে হয়েছে। এখনও বেশিরভাগ সময় হালকা চালের মুভিই দেখি। গভীর জীবন দর্শন টাইপ মুভিগুলো দেখার জন্য আমার আলাদা মেজাজ মর্জি থাকা লাগে। তাই সবসময় দেখা হয়ে উঠে না।
শুনেছিলাম জিবলির মুভিগুলোকে বলে ‘অ্যানিমে’, এক ধরনের জাপানী অ্যানিমেশন। জাপানী শুনেই আর দেখতে ইচ্ছে করতো না। জাপানী ভাষা বুঝবো না, দেখে মজা পাবো না, এরকম রঙ বেরঙের চিন্তা মাথায় আসতো। এই করতে করতে বত্রিশ বছর কাটলো, জিবলি দেখা হলো না। কিন্তু ২০১৯ সালে মনের সমস্ত ইচ্ছা জড়ো করে দেখতে বসলাম মাই নেইবার ততোরো। এটার নামও অনেকবার শুনেছি। তাই অ্যামাজন প্রাইম, এইচবিও ম্যাক্স, নেটফ্লিক্স ইত্যাদিতে ঢুঁ মেরে দেখলাম কোনটায় মুভিটা আছে। এইচবিও ম্যাক্সে দেখলাম এটার পাশাপাশি আরও অনেকগুলো জিবলি মুভি রাখা। সেই থেকে শুরু হল আমার জিবলি যাত্রা।
১) My Neighbor Totoro (সাল ১৯৮৮, পরিচালক Hayao Miyazaki)ঃ আমার জিবলিতে হাতে খড়ি হলো এই মুভি দিয়ে। কী আর কইত্তাম? বাচ্চাকাচ্চা নেওয়ার ইচ্ছে আমার কোনোকালেই ছিলো না, এখনও নেই। আমি অ্যান্টি নাটালিস্ট ঘরানার মানুষ। কিন্তু এখানে যে দুটো পিচ্চি মেয়েকে দেখিয়েছে, ওদের দেখে একবার হলেও বাচ্চাকাচ্চা নেওয়ার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম। যা হোক, আমি প্রথমে বুঝিনি জিবলির মুভিগুলোতে রূপকথার জগতের আনাগোনা থাকতে পারে। তাই যখন রূপকথাভিত্তিক জিনিসপাতি দেখানো শুরু করলো, আমি ‘পোলাপাইন্না টাইপ মুভি’ ভেবে দেখা বন্ধ করে দিতে চাচ্ছিলাম। পরে মনে হলো প্রিন্স যেহেতু রেকোমেন্ড করেছে, বুঝে শুনেই করেছে। কিছু নিশ্চয়ই আছে এই মুভিতে যেটা একে রেকোমেন্ডেবল করেছে। তাই দেখা চালিয়ে গেলাম। কি জানেন, সেজন্য এখনও নিজেকে ধন্যবাদ দিই। নইলে কি এই অসামান্য সৃষ্টি আমার অদেখা রয়ে যেতো না? মুভিটা শেষ করে আক্ষরিক অর্থে আঁক করে বসে ছিলাম। এত সুন্দর!
২) Spirited Away (সাল ২০০১, পরিচালক Hayao Miyazaki)ঃ এটা ছিলো আমার দেখা দ্বিতীয় জিবলি মুভি। দেখার আগে প্রিন্সকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেমন হবে মুভিটা। প্রিন্স বলেছিল এটা নাকি অনেক মুভি বোদ্ধার মতে জিবলির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি! উরেব্বাস, তাহলে তো দেখতেই হয়। এখানেও একটা পিচ্চি মেয়ের কাহিনী। সাথে আছে চরম কিউট এক ড্রাগন। এখনও মাঝে মাঝে চিন্তা করি কে আমার বেশি প্রিয়। পিচ্চিটা নাকি ড্রাগনটা? সত্যি বলতে, স্পিরিটেড অ্যাওয়েকে আমার জিবলির ম্যাগনাম ওপাস মনে হয়নি। জিবলির অন্য কিছু মুভিকেও আমার একই ক্যালিবারের মনে হয়েছে। অবশ্য এটা নিয়ে তর্ক করারও কিছু নেই। শিল্প সবসময়েই সাবজেক্টিভ। শিল্পের আস্বাদন নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের রুচির উপর।
৩) Kiki’s Delivery Service (সাল ১৯৮৯, পরিচালক Hayao Miyazaki)ঃ স্পিরিটেড অ্যাওয়ের পর বেশ লম্বা একটা বিরতি গিয়েছিলো। প্রায় দুই বছর পর এসে ধরেছিলাম কিকি’স ডেলিভারি সার্ভিস। এই মুভিটা দিয়ে আমি সত্যিকার অর্থে জিবলির রূপকথার জগতে ঢুকলাম। এটার কাহিনী কিকি নামের একটা কিশোরী জাদুকরকে ঘিরে। জাদুকর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য ওকে যেতে হবে অন্য একটা শহরে, বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে। সে শহরে গিয়ে কীভাবে কিকি টিকে থাকে, সেটা নিয়েই কাহিনী। এতো সুন্দর একটা মুভি! কিশোরী কিকির মনের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ আর ভালোবাসার সাথে আমার কিশোরী জীবনকে দারুণভাবে মেলাতে পেরেছিলাম।
৪) Princess Mononoke (সাল ১৯৯৭, পরিচালক Hayao Miyazaki)ঃ কিকি’স ডেলিভারি সার্ভিস-এর পর আবারও এক বছরের বিরতি। ২০২২ সালে এসে ধরলাম প্রিন্সেস মনোনোকে, আরেকটা জিবলি মাস্টারপিস। এখানে প্রোটাগোনিস্ট আর অ্যান্টাগোনিস্ট, দুইজনই মেয়ে। পাশ্চাত্য রূপকথার উপর নির্মিত হলিউডি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রগুলো যেখানে মেয়েদের অসহায় বা নায়কের উপর নির্ভরশীল হিসেবে দেখায়, সেখানে হায়ায়ো মিয়াযাকির নারী চরিত্রগুলো এতো ব্যাডঅ্যাস যে, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। অবশ্য হলিউডেও ইদানীং ব্যাডঅ্যাস কিশোরী চরিত্র দিয়ে অ্যানিমেশন বানানো হচ্ছে। Brave, Encanto, Moana, Frozen ইত্যাদি। যা হোক, প্রিন্সেস মনোনোকে দেখে আমার না শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা। একদিকে ভালো লাগছে মনোনোকেকে আর ওর প্রকৃতিপ্রেমকে, অন্যদিকে অ্যান্টাগোনিস্ট ইবোশির চরিত্রটা এতো মারাত্মক যে ওদিকেও হেলে পড়ছি। ইবোশি এতো দৃঢ়, স্বাধীনচেতা আর সমঝদার একটা নারী চরিত্র যে, ভালো না লেগে উপায় নেই। কিন্তু ওর চরিত্রের যে দিকটা বনাঞ্চলের ক্ষতি করতে চায়, সেটার জন্য ওকে বিরক্তও লাগছে। এখান থেকে বুঝলাম, কোনো চরিত্রকে সর্বাগ্রে ভালো লাগতে হবে, তা না। কিছু অংশ ভালো লাগতে পারে, কিছু অংশ হয়ত না। এটা স্বাভাবিক।
৫) Howl’s Moving Castle (সাল ২০০৪, পরিচালক Hayao Miyazaki)ঃ এই মুভিও দেখেছি ২০২২ সালে। দেখার পর থেকে এখনও প্রেমে পড়ে আছি মুভির নায়ক হাউলের। এরচেয়ে বেশি আর কীভাবে মুভিটার প্রশংসা করা যায়, আমার জানা নেই। মুভির নায়িকা সোফিকে পুরোটা সময় জুড়ে আমি হিংসে করে গেছি হাউলের এতো কাছে থাকতে পারছে বলে। উফ! এতো প্রেম আমার রক্তমাংসের নায়ক দেখেও মেলাদিন উথলে উঠেনি। সেই ২০১৩ সালে বিবিসির ‘শার্লক’ টিভি সিরিজের প্রথম দুই সিজন দেখে বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচের দিওয়ানা হয়েছিলাম। এরপর এই হাউল। কী তার চলন, কী তার যত্ন নেওয়ার বাহার, কী তার মিষ্টি ব্যবহার! দেখার মাঝে প্রিন্সকে গিয়ে বললাম, “হাউলকে আমার সেই মনে ধরেছে। তুমি হাউল।” তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কে? সোফি?” প্রিন্স বললো, “তুমি ক্যালসিফার। ওরেই আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হইছে।” এই মুভি দেখার পর মনে হলো, মাই নেইবার ততোরো যদি হয় আমার সবচেয়ে পছন্দের জিবলি মুভি, তাহলে দ্বিতীয় স্থানে থাকবে হাউল’স মুভিং ক্যাসেল। মুভিটা এত ভালো লেগেছে! জানি না যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে মিষ্টি একটা প্রেমকাহিনী দেখে মনটা দুব্বল হয়ে পড়েছে কিনা…। তাই আগুনে ইবলিশ হতেও আমার আপত্তি নেই। ব্যাটারে আমারও পছন্দ হইছে।
(পরবর্তী খণ্ডে সমাপ্ত)