কোথা থেকে কোথায় এসেছি! 

0 0
Read Time15 Minute, 57 Second

খুশির একটা খবর দিতে এলাম। সেপ্টেম্বর থেকে আমি হিউস্টন মেথোডিস্ট হাসপাতালে দ্বিতীয় পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ শুরু করতে যাচ্ছি। গত এক বছর এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টার আমাকে অনেক দিয়েছে। এবার পাওয়ার আশা করছি হিউস্টন মেথোডিস্ট থেকে। হি হি! যখনই জীবনে এই ধরনের অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে, আমার মনে পড়ে ২০০৫ সালের এইচএসসিতে ৩.৯০ পাওয়া নির্ঝরের কথা। জীবনটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল কম সিজিপিএর কারণে। মেডিকেল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় – সবকিছুই অধরা হয়ে গিয়েছিল। শেষে ঠাঁই হয়েছিল আজিমপুর গার্হস্থ্য অর্থনীতি মহাবিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগে। বন্ধুবান্ধবরা একেকজন মেডিকেল, বুয়েট, ঢাকা ভার্সিটি আর আমি সরকারি কলেজ। সমাজের চাপে সবসময় ছোট হয়ে থাকতাম, তার উপর খাদ্য ও পুষ্টি ছিল এমন একটা বিষয় যেটার নাম আগে কোনোদিন শুনিনি। সেই বিষয়ে পড়তে এসেছি এমন একটা কলেজে, যেটা কাউকে চেনানোও কষ্টকর ছিল। সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি শেষ। কোনোমতে স্নাতক সম্মান পাশ করে চাকরির যোগাড় শুরু করলাম। এক গবেষক টাকা দেবেন দেবেন করে তিন মাস একটা প্রোজেক্টে বেগার খাটিয়ে নিলেন। শেষে বললেন, টাকাই সব নয়। উনার অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা দিয়ে নাকি আমি ভালো জায়গায় সুযোগ পাব। সে সুযোগ আর এলো না। ফলে বাংলাদেশের সাধারণ দৃশ্যপটে ঢুকে গেলাম, যেখানে এক বিষয়ে পড়াশোনা করে মানুষ আরেক বিষয়ে চাকরি করে। আমি পুষ্টিতে পড়ে চাকরি নিলাম এক বায়িং হাউজে (রেডিমেড গার্মেন্টস ব্যবসা)। আমার গুষ্টির অনেকেই বায়িং হাউজে মার্চেন্ডাইজার পদে চাকরি করত। তাদের বেতন খুব ভালো ছিল বলে আমারও লোভ হয়েছিল মার্চেন্ডাইজার হওয়ার। কিন্তু পোশাকশিল্পে একেবারেই কোনও অভিজ্ঞতা না থাকায় চাকরিজীবন শুরু হল গাজীপুরের বোর্ডবাজারে অবস্থিত এক ওয়ারহাউজে, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে।

২০১০ সালে ৮০০০ টাকা দিয়ে শুরু হল আমার পূর্ণকালীন চাকরি জীবন। ঢাকা থেকে অফিস প্রদত্ত মুড়ির টিন মার্কা বাসে করে সকাল সাতটায় রওনা দিতাম, সন্ধ্যা সাতটায় অফিস শেষ করে ঢাকায় ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা। অবশ্য যোগদানের তিন মাস পরেই QC থেকে Assistant Manager পদে উন্নীত হয়েছিলাম। বেতন বেড়ে হয়েছিল ১৫০০০ টাকা, কিন্তু সন্তুষ্টি আসছিল না। কবে মার্চেন্ডাইজার হব আর পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন পাব? বছর খানেক পর মা-বাবা চেপে ধরলেন পুষ্টিতে মাস্টার্স শেষ করার জন্য। আমিও ‘বায়িং সেক্টরে বুঝি ক্যারিয়ার আর এগুবে না’ ভেবে ওয়ারহাউজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয়বারের মত পুষ্টিবিজ্ঞানে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী হলাম। ২০১২ সালে মাস্টার্স শেষ করে আবারো পুষ্টিতে চাকরি খোঁজা শুরু করলাম। এক ক্লাসমেটকে পেলাম যে মাস্টার্স শেষে এক ওয়েলনেস সেন্টারে পুষ্টিবিদ হিসেবে চাকরি শুরু করেছে। ওর রেফারেন্সে ইন্টার্ভিউ দিতে গেলাম, চাকরি হয়েও গেল। বেতন সেই ১৫০০০ টাকাই। বলা হল পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে প্রতি বছর বেতন বাড়ে। সাথে বোনাস পাওয়া যায় যদি সেন্টারে নতুন ক্লায়েন্ট এনে দিতে পারি। আমি অন্তর্মুখী মানুষ, একদমই বাকপটু নই। ‘পিপল পার্সন’ হওয়া তো দূরের কথা। চোখের সামনে দিয়ে সহকর্মীরা নতুন ক্লায়েন্ট অ্যাড করে ফেলছে আর আমি পুরাতন ক্লায়েন্টদের সাথেই কথা কইতে হিমশিম খাচ্ছি। ফলে এই চাকরিতেও তৈরি হল হতাশা আর আত্মবিশ্বাসের খামতি।

ওই সময় যে বায়িং হাউজ ছেড়ে এসেছিলাম, সেখান থেকে একটা কল এলো। তারা আমাকে খুব পছন্দ করত। তাই একটা নতুন পদ তৈরি হওয়ার পর সেটার জন্য আমাকেই তাদের প্রথম পছন্দ ছিল। কিন্তু আবার যাব সেই কষ্টকর গার্মেন্টস সেক্টরে? দোনোমনা করতে করতে বললাম, ‘বর্তমান চাকরিতে আমি সন্তুষ্ট। চাকরি ছাড়তে চাই না। তাছাড়া গাজীপুর টাইপ লোকেশন আমার জন্য কষ্টকর।’ শুনে বায়িং হাউজের এক ঊর্ধ্বস্তন কর্মকর্তা বললেন, ‘তুমি কত পাও এখন?’ বললাম, ‘বিশ হাজার।’ উনি বললেন, ‘তোমাকে আমরা ত্রিশ হাজার দেব। তুমি জয়েন কর। আর হ্যাঁ, লোকেশন গুলশানে।’ এরপর আর ভাবাভাবির কিছু থাকে, বলুন? ২০১৩ সালে ওয়েলনেস সেন্টার তথা পুষ্টিবিজ্ঞানকে বিদায় দিয়ে চলে এলাম পোশাকশিল্পে। যোগ দিলাম কোয়ালিটি ম্যানেজার হিসেবে। বছর খানেকের মাথায় আমার মানসিক শান্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল। সারাদিন সাপ্লায়ারদের সাথে খিটিমিটি, তাদের থেকে কাজ আদায় করে নেওয়া – মোট কথা, সারাক্ষণ মানুষের সাথে উঠাবসা করা আমার মত অন্তর্মুখী মানুষের জন্য ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াল। গার্মেন্টসের দুনিয়া আমার জন্য নয় বুঝার পর থেকে আমি বিদেশে কীভাবে পড়তে আসা যায় এই বিষয়ে গবেষণা শুরু করলাম। এটা ২০১৪ সালের কথা। আমি প্রথমে ইউরোপে চেষ্টা করছিলাম কারণ ধরেই নিয়েছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে আমার মিডিওকার প্রোফাইল দিয়ে সুযোগ পাব না। কিন্তু বন্ধু ফরহাদ মাসুম বলল যুক্তরাষ্ট্রে চেষ্টা করে দেখতে। ওর কথা শুনে রাত নয়টায় বাসায় ফিরে GRE আর IELTS-এর প্রস্তুতি নেওয়া, ভার্সিটি বাছাই করা, প্রফেসর খোঁজা চলতে থাকল। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেও শিঁকে ছিঁড়ল না। ২০১৬ সালে বস ডেকে নিয়ে বললেন, ‘তোমাকে মার্চেন্ডাইজার হিসেবে প্রমোশন দিতে চাই।’ অন্যসময় হলে আমি সেই লেভেলের খুশি হতাম। কিন্তু এখন আমার লক্ষ্য আমেরিকায় পড়তে আসা। তাই বেতন বেড়ে চল্লিশ হাজার হয়েছে বলে খুশি হলাম, মার্চেন্ডাইজার হয়েছি বলে নয়।

২০১৭ সালেও কোথাও অ্যাডমিশন হল না। তবে ওই বছরই বিয়ে করলাম আমি আর প্রিন্স। করার পর একদিন কথা নেই বার্তা নেই, প্রচণ্ড হতাশ হয়ে প্রিন্সকে বললাম, ‘গত বছর আমার IELTS-এর মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। আমি আর IELTS দিতে পারব না। ২০১৮ সালের জন্য আর চেষ্টা করব না।’ প্রিন্স তখন মাথায় ঠাডা পড়লে মানুষ যেমন পাথর হয়ে যায়, তেমন হল। আমি যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে সুযোগ হচ্ছে না দেখে একপ্রকার ছেড়েই দিতে চেয়েছিলাম চেষ্টা করা, সে কিন্তু আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারায়নি। ফের IELTS দিতে প্রেষণা দিয়েছে, এপ্লিকেশন পাঠাতে প্রেষণা দিয়েছে। প্রিন্সের কারণে আমি ২০১৮ সালে আবেদন করেছিলাম, আর অ্যাডমিশন হয়েও গিয়েছিল। মজার ব্যাপার হল, ওই সময় বস আবারো ডেকে বললেন, ‘তোমাকে নিয়ে সামনে আরেকটা পরিকল্পনা আছে।’ কিন্তু সেই পরিকল্পনায় পানি ঢেলে আমি এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে পাড়ি দিলাম যেখানে আমাকে আবার পড়াশোনা শুরু করতে হবে। কিন্তু পড়াশোনা করাটাই তখন আমার কাছে আকাঙ্ক্ষিত বস্তু। আমি বুঝে গেছি বায়িং হাউজের চাকরি আমার জন্য নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে যে প্রফেসর আমাকে নিয়ে এসেছিলেন গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে, আমি উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কী দেখে আমাকে উনি নির্বাচিত করেছিলেন। উনি বললেন, এপ্লিক্যান্ট পুলের সবার সমমানের প্রোফাইল দেখার পর উনি চেষ্টা করছিলেন underpriviledged কাউকে নির্বাচিত করার। উনি নিজে underpriviledged সমাজ থেকে উঠে আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। জ্যামাইকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন উন্নত ভবিষ্যতের আসায়। আমাকে দেখে উনার নিজের কথা মনে পড়েছিল। উনি চেয়েছিলেন, উনি যে সুযোগ পেয়েছিলেন, একই সুযোগ আরেকজনকে দেওয়া যায় কিনা। ব্যাপারটা আমাকে অভিভূত করেছিল। আমি উনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

এরপর আবারো ধাক্কা খেলাম জীবনে, এবার এক মহামারি এসে আক্ষরিক অর্থে সবকিছু ওলট পালট করে দিল। তারপরও বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পিএইচডি করতে এলাম টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ে। কথা হল, বাংলাদেশে বসে যখন আমি আমেরিকার ভার্সিটির তালিকা বানিয়েছিলাম, তখন টেক্সাস এঅ্যান্ডএমকে রেখেছিলাম ‘চান্স পাওয়া সবচেয়ে কঠিন’-এর তালিকায়। কখনো সাহসই হয়নি এখানে আবেদন করার। অথচ জীবন আমাকে এখানেই নিয়ে এলো। আমি সাহস করে McGill University আর University of Toronto-তেও আবেদন করেছিলাম। এগুলোতে না হলে নাই, কিন্তু হলে নিজের মেধার দৌড় কতটুকু, সেটা বুঝতে পারব। মজার ব্যাপার হল, এগুলো থেকেও এডমিশন এসেছিল। শুধুমাত্র ফান্ড ম্যানেজ করতে পারিনি দেখে যেতে পারিনি। সেখানে কোভিডের ঝক্কির ভেতরে কীভাবে যে টামু থেকে ডিপার্টমেন্টাল ফান্ড ম্যানেজ হল, আজও রহস্য। সেজন্য আমি আমার পিএইচডি অ্যাডভাইজরের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

এরপর পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ পেলাম MD Anderson Cancer Center-এর Health Services Research অনুষদ থেকে। যখন আবেদন করেছিলাম, তখন এক ফোঁটাও আশা ছিল না যে, দুনিয়ার এক নম্বর কর্কট রোগ গবেষণা কেন্দ্রে আমি পোস্টডক করব। যেহেতু আবেদন করতে টাকা লাগে না, তাই যেখানেই মনের মত টপিক পাচ্ছিলাম, আবেদন করছিলাম। যেদিন অফার লেটার এলো, সেদিন ভিডিও করে রেখেছিলাম। MD Anderson Cancer Center জানতে চাইছে, ‘নির্ঝর, তুমি কি আমাদের এইখানে পোস্টডকের অফার গ্রহণ করতে রাজি? হ্যাঁ, না।’ আমার মনে হচ্ছিল, স্বপ্ন দেখছি। আমি চাইলে শত মানুষের আরাধ্য এই প্রতিষ্ঠানের অফারকে ‘না’ বলে দিতে পারি। খাইছে!

এই বছর আবারো যাচ্ছি আরেকটা পোস্টডক করতে। এবার টেক্সাসের এক নম্বর হাসপাতালে। এটা যে এক নাম্বার হাসপাতাল, সেটা আমি জেনেছি ইন্টার্ভিউয়ারের কাছ থেকে। গর্বিতভাবে উনি বলছিলেন, গত ১৫ বছর ধরে হিউস্টন মেথোডিস্ট টেক্সাসের এক নাম্বার হাসপাতাল হয়ে আসছে। আমি তখন চাকরির জন্য মরিয়া। এটা যদি ৫০০-তম হাসপাতালও হত, আমি চাকরিটা নিতাম। র‍্যাংকিং জানতে ভালো লাগে, এই পর্যন্তই। এটাকে প্রধান প্যারামিটার বানানোর বিপক্ষে  আমি। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর যেহেতু নামীদামী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার সুযোগ ঘটেছে, আমার কাছে র‍্যাংকিংয়ের চেয়ে ওরা আমাকে কীভাবে ট্রিট করে, সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

যা হোক, এইচএসসিতে ৩.৯০ পাওয়া নির্ঝর কিংবা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে পড়ুয়া নির্ঝর, কিংবা যাদের কথা শুনত শুনতে আমার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল এবং আমি ভাবা শুরু করেছিলাম আমার মাথাভর্তি গোবর, আমি জীবনে কিছুই করতে পারব না, যে শিক্ষক আমাকে রিকোমেন্ডেশন লেটার দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘নিজের চেষ্টায় যখন আমেরিকায় হচ্ছে না, তখন কাউকে বিয়ে করে চলে যাও’, তাদের বলতে ইচ্ছে করে, আমাকে কারো মুখাপেক্ষী হতে হয়নি। আমি জীবনে যা যা চেয়েছি, সবই আগে পরে পেয়েছি। সবই নিজে অর্জন করেছি। একটা সময় পা হড়কে গিয়েছিল, কিন্তু উঠে দাঁড়িয়েছি। আমেরিকায় আসতে চেয়েছি, এসেছি। পিএইচডি করতে চেয়েছি, করে ছেড়েছি। বিশ্বখ্যাত কোনো একটা Cancer Center-এ ক্যান্সারের উপর কাজ করতে চেয়েছি, করে দেখিয়েছি। আমি ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড মানুষ না। কিন্তু কিছুতে মন আটকে গেলে সেটার পিছে লেগে থাকি। তাই যখন যেটা চেয়েছি, সেটা পেয়েছি। আমার পাশে যেমন অসভ্য মানুষ ছিল যারা প্রতি পদে আমাকে হেয় করেছে, তেমনি সভ্য আর দয়ালু মানুষও ছিল যারা অনুপ্রেরণা দিয়েছে। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, নির্ঝর আজ কত পথ পাড়ি দিয়ে কোথা থেকে কোথায় এসেছে!

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post পাইলাম, আমি ইহাকে (এহেম… এহেম… ড্রাইভিং লাইসেন্স) পাইলাম