1 0
Read Time10 Minute, 35 Second

প্রথম পর্ব

টেক্সাসে বাসা ভাড়া নিতে হবে। ধুমিয়ে বাসা খুঁজছি। অনলাইনে বাসা খোঁজার বেলায় আমার প্রথম পছন্দ এপার্টমেন্টস ডট কম। খুবই গোছালো একটা ওয়েবসাইট। এলাকা আর যিপ কোড লিখে সার্চ দিলে ওয়েবসাইটে বাসার তালিকা দেখা যায়। সেখান থেকে ভাড়া অনুযায়ী ফিল্টার করে বেশ কিছু বাসা পেলাম। দুই হাজার ডলারের বাসা যেমন আছে, চারশো ডলারেরও আছে। আমরা বাটলারে আটশো ডলার ভাড়া দিই যেটা আমাদের জন্য খুবই বেশি। কিন্তু সস্তা কিছু খুঁজে না পেয়ে এটাই নিতে হয়েছিল। এবার টেক্সাসে ছয়শো ডলারের মধ্যে বাসা নেওয়ার পরিকল্পনা করছি। কলেজ স্টেশন যেহেতু কলেজ টাউন, এখানে শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য সস্তায় ভালো বাসা থাকার কথা। কলেজ টাউন মানে, ঐ শহরের বাসিন্দা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মচারী। কিন্তু বাস্তবতা দেখলাম অন্যরকম। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই কলেজ টাউনের বেশিরভাগ বাসা তৈরি হয় শেয়ার করে থাকার জন্য। যেমন, চার বেডরুমের বাসায় চারজন শিক্ষার্থী ভাগাভাগি করে থাকে। প্রত্যেকের জন্য একটা বেডরুম। বাসা ভাড়া দুই হাজার হলে প্রত্যেকের ভাগে পড়ে পাঁচশো ডলার। এই পদ্ধতি একজন একলা শিক্ষার্থীর থাকার জন্য খুবই সস্তা এবং উপযুক্ত। কিন্তু সমস্যায় পড়ে যায় যারা দোকলা। পরিবার নিয়ে থাকার মত বাসা খুঁজতে গেলেই ভাড়া হুহু করে বেড়ে যায়। বাসা মানে তো শুধু একটা ঘর নয়। সেখানে আলো বাতাস ঢুকে কিনা, খোলামেলা কিনা, বাথরুম কেমন, ক্লজেট কয়টা, আশেপাশের পাড়া কেমন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরত্ব কত – এসবও দেখতে হয়। আমাদের আবার এক টুকরো বারান্দারও শখ। তাই সবকিছু মিলিয়ে বাসা পাওয়া, তাও ছয়শো ডলারের মধ্যে, কঠিন হয়ে গেল। অফিসে বসে বাসা খুঁজি, বাসায় ফিরে বাসা খুঁজি, ঘুমাতে গিয়ে বাসা খুঁজি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাসা ভাড়া নেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য মোটেও সুখকর নয়। ২০১৮ সালে যখন প্রথম এলাম, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে বাসা খুঁজেছি। পেয়েছিলামও বেশ কিছু। কিন্তু যখন ওরা শোনে আমরা এদেশে নতুন এসেছি, কোনো ক্রেডিট স্কোর নেই, আয়-রোজগারের রেকর্ড নেই, রেন্টাল হিস্টোরি নেই, তখন আবেদন নাকচ করে দেয়। এদেশে ক্রেডিট স্কোরের মূল্য অনেক। এজন্য আসার সাথে সাথে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে নিতে হয়। ধীরে ধীরে ক্রেডিট স্কোর বানাতে হয়। ক্রেডিট মানে ঋণ। আপনি ঋণ নিয়ে সেটা ঠিকমত শোধ করছেন কিনা, সেটার উপর গড়ে উঠে আপনার ক্রেডিট স্কোর। এজন্য দেখবেন সবাই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করে। তারপর ডেবিট একাউন্টের মাধ্যমে সে ঋণ পরিশোধ করে। আমরাও ডিস্কোভার নামে একখানা ক্রেডিট কার্ড নিয়ে নিলাম। এটা পাওয়া সবচেয়ে সহজ বলে বিদেশী শিক্ষার্থীরা এটা দিয়েই ঋণগ্রস্ত হওয়া শুরু করে। শুরুতে ডিস্কোভার মাত্র পনেরশো ডলারের ক্রেডিট লিমিট দেয়। অর্থাৎ মাসে পনেরশো ডলারের বেশি খরচ করতে পারবেন না। ভালো ক্রেডিট স্কোর গড়লে এই লিমিট বাড়তে থাকে। মুশকিল হল, কার্ড নিলেই তো আর একমাসে বড়সড় ক্রেডিট স্কোর তৈরি হয়ে যায় না। আমরা টাকা খরচ করি কেবল গেরস্থালী জিনিসপত্রের পিছে। সেটা দিয়ে উচ্চমানের স্কোর বানাতে বছরখানেক সময় লাগবে। এই ফাঁকে বলে রাখি, এক ধাক্কায় ভালো স্কোর তৈরির উপায় হল কার্ড দিয়ে বড় ধরনের কেনাকাটা করা (যেমন গাড়ি, বাড়ি) বা বড় ধরনের ঋণ নেওয়া, আর সময়মত সেগুলো পরিশোধ করা। আমাদের সে পথে হাঁটার উপায় নেই বলে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। শেষে শাওন ভাইয়ের বন্ধু মূর্তির মাধ্যমে একটা এপার্টমেন্টে উঠতে পেরেছিলাম। সে গল্প আরেক জায়গায় করেছি। এখন আসি বাটলারে বাসা খোঁজার গল্পে।

বাটলারে বাসা খোঁজার বেলায়ও পরম বন্ধু ছিল এপার্টমেন্টস ডট কম। আমার চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর মাত্র একমাস সময় পেয়েছিলাম বাসা খোঁজার জন্য। তখন আগস্ট মাস। আগস্ট হল হেমন্তকাল বা ফল সিজন (fall)। সে সময় পশ্চিমা দেশগুলোতে নতুন করে সবকিছু করার হিড়িক পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন সেমিস্টার শুরু হয়, মানুষজন নতুন বাসায় উঠে। নতুন বাসায় উঠার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু হয় অন্তত তিন মাস আগে, মানে মে-জুন নাগাদ। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য কিছু অগ্রীমের বিনিময়ে মানুষ পছন্দের বাসা ধরে রাখে। আর আমাদের বাসা খোঁজা শুরুই হল আগস্টে। ততদিনে সস্তা বাসাগুলো ভাড়া হয়ে গেছে। যেগুলো বাকি, সবগুলো আটশো থেকে নয়শোর মধ্যে। এগুলোর ভেতর চারটা বাসার সাথে যোগাযোগ করলাম। দিনক্ষণ ঠিক করে সেন্ট লুইস থেকে ষোল ঘণ্টা ড্রাইভ করে বাটলারে এলাম সেগুলো দেখতে। আমাদের ধারণা ছিল না বাটলার পাহাড়ি এলাকা। এসে দেখি চারটে বাসায়ই উঁচুনিচু রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। একটা তো এমনই বনের ভিতর যে, বাসার সামনে হরিণের আনাগোনাও দেখলাম। আরেকটায় যেতে হল ভীষণ খাড়া আর সরু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে। গ্রীষ্মকালেই এই রাস্তা দেখে হাত-পা জমে যাচ্ছে। শীতকালে বরফ ভেঙে কীভাবে গাড়ি চালাব? শেষমেশ দেখা যাবে খাদে পড়ে মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যু নামক হেডলাইন হয়ে গেছি। আসলে এসব জায়গায় থাকার জন্য পাহাড়ি রাস্তায় অভ্যস্ত ড্রাইভার প্রয়োজন। আমাদের সেই অভ্যস্ততা নেই। এক বছর বাটলারে থাকলে হবে। তাই এ দুটো বাদ দিয়ে বাকি দুটোর দিকে নজর দিলাম। সবচেয়ে বেশি মনে ধরল বর্তমান বাসাটা। কিছু টাকা দিয়ে বুক করে ফেললাম। এরপর এখানে এসেই উঠলাম।

সেন্ট লুইস এবং বাটলার, উভয় জায়গায়ই বাসা ভাড়া করতে গিয়ে বুঝেছি চর্মচক্ষে দেখে বাসা ভাড়া নেওয়া দরকার। ছবিতে খুব সুন্দর লাগে অথচ সামনাসামনি অনেক ভুলত্রুটি চোখে পড়ে। কিন্তু কলেজ স্টেশনের বেলায় চোখে দেখে বাসা খোঁজার অবস্থা রইল না। বাটলার থেকে কলেজ স্টেশনের দূরত্ব অনেক। গাড়ি চালিয়ে যেতে আড়াই থেকে তিনদিন লাগবে। বিমানে যে যাব, সে টাকা নেই। তাই ছবি দেখে আর রিভিউ পড়েই বাসা নেওয়ার মিশনে নামলাম। এবার এপার্টমেন্টস ডট কমের সাথে ফেসবুক মার্কেটপ্লেসও যোগ হল। ফেসবুকের ‘টেক্সাস এঅ্যান্ডএম হাউজিং, সাবলেট’ নামের এক গ্রুপেও যোগ দিলাম। সব জায়গায় চিরুনি তল্লাশি চলতে লাগল। অবশেষে ঐ গ্রুপে একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম সাড়ে ছয়শো ডলারের মধ্যে দুই বেডরুমের বাসা। সাথে সাথে এপার্টমেন্টস ডট কমে ঢুকলাম। এখানে বাসার ছবি আর ভিডিও পাওয়া যায়। দেখে পছন্দ হল খুব। নক দিলাম ম্যানেজমেন্টকে। সাবধানের মার নেই বলে এদের পাশাপাশি আরও পাঁচ-ছয়টা বাসায় নক দিয়ে রাখলাম। কথা বলে পছন্দ হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।

সবার সাথে কথা বলে সাড়ে ছয়শো ডলারের বাসাটাই ভাল লাগল। দুই বেডরুমের বাসা এরা এত কমে কীভাবে দিচ্ছে, জানি না। অন্যরা যেখানে সাতশোর কমে পারছে না, সেখানে এদের কমে ছাড়ার পেছনে ছারপোকা, তেলাপোকা, ছাদ থেকে পানি পড়ে টাইপ গণ্ডগোল নেই তো? রিভিউয়ে অবশ্য এরকম কিছু দেখলাম না। যা হোক, সন্দেহ সরিয়ে রেখে এক বছরের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেললাম। হাল বেশি খারাপ হলে এক বছর পর এখানকার পাট চুকিয়ে অন্য এপার্টমেন্টে চলে যাব।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
100 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post টেক্সাসে যাওয়ার প্রস্তুতি
Next post আমেরিকায় রান্না বান্না