পেন্সিল্ভেনিয়ার বাটলার শহরে বসে দুটো ব্লগ পোস্ট লিখেছিলাম টেক্সাসে আসার প্রস্তুতি নিয়ে। আজ ব্লগিং করছি টেক্সাসের মাটিতে বসে। জীবন কী অদ্ভুত! কিশোরবেলায় পড়া ওয়েস্টার্ন গল্পগুলোয় যে টেক্সাসের বর্ণনা পড়তাম, আমি এখন সেখানে থাকি। দেশে থাকতে নিউইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়া বাদে আমেরিকার আরেক যে অঙ্গরাজ্যের নাম শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, সেটা হলো টেক্সাস। সে টেক্সাসে নাকি চলে এসেছি! মাস্টার্স করার জন্য যখন মিজৌরিতে এলাম, তখনও ভাবিনি পিএইচডির জন্য টেক্সাসে আসার সুযোগ পাব। টেক্সাসের তিনটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুষ্টিবিজ্ঞানের উপর পিএইচডি করার সুযোগ আছে। ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিন, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি অ্যাট কলেজ স্টেশন, আর টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটি। তিনটাতেই অনেক ভাল ভাল গবেষণা হয়। এগুলোর পুষ্টি বিভাগে ভর্তি হওয়াও অনেক প্রতিযোগিতার ব্যাপার। ২০১৫ সাল থেকে এগুলোর পিএইচডি প্রোগ্রামের সাথে যোগাযোগ করছি, কিন্তু মিডিওকোর প্রোফাইলের জন্য পাত্তা পাচ্ছিলাম না। বেশিরভাগ প্রফেসর ইমেইলের উত্তর দিচ্ছিলেন না। যারা দিচ্ছিলেন, তাদের কাছ থেকে পাচ্ছিলাম নেতিবাচক উত্তর। তাই সম্ভাব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা থেকে টেক্সাস বাদ দিয়েছিলাম। আমেরিকা থেকে একটা মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার পর মনে হল, এবার টেক্সাসে চেষ্টা করা যাক। ফল ২০২০-এ পিএইচডির জন্য অস্টিনের এক প্রফেসরের কাছে ইন্টার্ভিউ দিলাম। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “পাবলিকেশন আছে?” বললাম, “না।” জানতে চাইলেন, “গবেষণায় কোন কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করেছ?” বললাম, “কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করিনি, তবে আমি SPSS-এ কাজ করতে পারি।” উনি দমে গিয়ে বললেন, “R পার?” এবার আমার হতাশ হওয়ার পালা। বললাম, “এখনও পর্যন্ত না, তবে শেখা শুরু করেছি।” উনি হাই তুললেন। আমিও বুঝলাম, অস্টিনে পড়ার সুযোগ খতম। এই প্রফেসরের সাথে আমার রিসার্চ ইন্টারেস্ট সবচেয়ে বেশি মিলেছে। উনার প্রত্যাশার সাথেই যদি আমার প্রোফাইল না মিলে, অন্যদের নক দেওয়া স্রেফ সময়ের অপচয়।
ফল ২০২০-এর পর ফল ২০২১-এর পালা। এবার আর অস্টিনের দিকে তাকাইনি। তাকালাম এঅ্যান্ডএম আর টেক্সাস টেকের দিকে। অদ্ভুত ব্যাপার, দুটোতেই অ্যাডমিশন হল। আরও মজার ব্যাপার হল , এঅ্যান্ডএমে অ্যাডমিশন হল ফলিত (অ্যাপ্লায়েড) পুষ্টিবিজ্ঞানে, টেকে হল ক্লিনিক্যালে। দুটো ভিন্ন শাখায় অ্যাডমিশন পেয়ে আমি মধুর সমস্যায় পড়লাম। কোনটা ছেড়ে কোনটা নেব? অবশেষে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার, জব পারস্পেক্টিভ, সুপারভাইজরের সাথে বনিবনা, রিসার্চ স্কোপ, কাজ শেখার সুযোগ, ইত্যাদি বিবেচনা করে এঅ্যান্ডএমের অফারই একসেপ্ট করে ফেললাম। তা তো করলাম। কিন্তু আমার ধারণা ছিল না টেক্সাসের আবহাওয়া সম্পর্কে। জানতাম গরম, কিন্তু কতই বা গরম হতে পারে? পেনসিল্ভেনিয়ায় যেখানে চাকরি করতাম, সেখানকার সহকর্মীরা টেক্সাসের কথা শুনে খিকখিক হাসল। বলল, “অত গরমে তুমি টিকতে পারবে?” আমি বুক চিতিয়ে জবাব দিলাম, “গরমের দেশের মানুষরে দেখাও গরমের ডর?” বলে পোঁটলাপুটলি গাড়িতে ঢুকিয়ে রওনা দিলাম টেক্সাসের উদ্দেশ্যে। গন্তব্য কলেজ স্টেশন নামের ছোট্ট শহর। এখানেই ভার্সিটির মূল ক্যাম্পাস।
যদি ঝটিকা বাসের মত বিরতিহীন ড্রাইভ করি, আমাদের পুরো ভ্রমণ হবে একুশ ঘণ্টার। অত চাপ কে নেয়, বাপু? আমরা তিন, চার ঘণ্টা পরপর দশ, পনেরো মিনিটের বিরতি নিই। বাথরুমে যাওয়া লাগে, গ্যাস ভরা লাগে, খাওয়া লাগে। সবকিছু মিলিয়ে মোট সময় লাগবে চব্বিশ ঘণ্টা। গুগল মানচিত্র দেখে বুঝলাম আমরা ওহাইও, কেন্টাকি, টেনেসি আর আরকান্সা পার হয়ে টেক্সাসে ঢুকব। প্রতিদিন গড়ে আট ঘণ্টা গাড়ি চালালে টেক্সাসে পৌঁছতে তিন দিন লাগবে। ঠিক করলাম, কেন্টাকি আর আরকান্সায় রাতে থাকব। তাই সস্তা দেখে মোটেল বুক করলাম। ইকোনো লজ, সুপার এইট, মোটেল সিক্স, ইত্যাদি অনেক ধরনের সস্তা মোটেল পাবেন। সেবাও বেশ ভাল। তো, দেখতে দেখতে পেন্সিল্ভেনিয়ায় আমাদের শেষ দিন ঘনিয়ে এল। জুলাইয়ের ত্রিশ তারিখে বাটলার থেকে টেক্সাসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার কথা। সকাল নয়টার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। তার আগে শেষবারের মত বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মন ভরে উপভোগ করে নিলাম পাহাড়ি সৌন্দর্য। উত্তপ্ত মরুর দেশে যাচ্ছি বলে মনটা খারাপ হয়ে আছে। কিন্তু এও ঠিক, নতুন রোমাঞ্চ শুরু হচ্ছে। মিডওয়েস্ট থেকে নর্থইস্ট হয়ে সাউথওয়েস্ট। মোটা দাগে আমেরিকার তিন অঞ্চল ঘুরে ফেলছি। বাকি থাকছে ওয়েস্ট কোস্ট আর নর্থওয়েস্ট। সহকর্মীরা যখন জিজ্ঞেস করছিল, “পিএইচডি শেষে কোন অঞ্চলে যেতে চাও?”, বলেছিলাম, “নর্থওয়েস্ট।” দেখি, ভবিষ্যৎ কোথায় লিখতে পারি।

পেন্সিল্ভেনিয়া থেকে যতই বাইরে আসছি, ততই বড় পাহাড়ের সারি কমে যাচ্ছে। একসময় ব্লু রিজ মাউন্টেন দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। এদের নাম ব্লু রিজ হয়েছে কারণ পাহাড়গুলোর রঙ সবুজ না দেখিয়ে নীল দেখায়। জন ডেনভার তার ‘কান্ট্রি রোডস’ গান দিয়ে বিখ্যাত করে রেখেছেন এই পর্বতশ্রেণী। প্রশ্ন জাগতে পারে, পাহাড়ের রঙ কীভাবে নীল হয়? আসলে এসব পাহাড়ে গজানো গাছপালা বায়ুমণ্ডলে আইসোপ্রিন নামের একটা রাসায়নিক যৌগ নিঃসরণ করে। এর কারণে পাহাড়ের উপর পাতলা কুয়াশার মত আস্তরণ তৈরি হয় আর পাহাড়গুলোকে লাগে নীল রঙের। এ এক অদ্ভুত সৌন্দর্য! আমরা ভার্জিনিয়ার শিনান্ডোয়া জাতীয় উদ্যানে গিয়েছিলাম ব্লু রিজ পর্বতশ্রেণী উপভোগ করতে। সে অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাদা লেখা আসবে। যা হোক, আমরা কেন্টাকির কেইভ সিটিতে রাতে থাকব। শহরটার নাম কেইভ সিটি কারণ এখানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কেইভ সিস্টেম বা গুহা ব্যবস্থা অবস্থিত। সর্ববৃহৎ বলে সিস্টেমের নামই রেখে দিয়েছে ‘ম্যামথ কেইভ’ (ম্যামথ শব্দের অর্থ প্রকাণ্ড)। এই গুহা আবার একটা জাতীয় উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু আমার ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো জাতীয় উদ্যান ঘুরার, তাই পরিকল্পনা করলাম ম্যামথ কেইভ জাতীয় উদ্যানেও ঘুরতে যাব। সাথে ঢুঁ মারব ম্যামথ গুহায়। পরে দেখি এই গুহা এত বড় যে, অনেকগুলো অংশে ভাগ করা হয়েছে। একেক অংশের জন্য আলাদা টিকেটের ব্যবস্থা। যেসব অংশ বেশি রোমাঞ্চকর, সেখানে টিকেটের দাম বেশি। সেটা সমস্যা না। সমস্যা হল, আমরা যেদিন কেইভ সিটিতে যাচ্ছি, সেদিন ঐসব অংশের একটার স্লটও খালি নেই। শুধু কম রোমাঞ্চকর অংশের টিকিট আছে। মাত্র ক’দিন আগে ভার্জিনিয়ার ‘লুরে গুহা’ দেখে এসেছি বলে সাধারণ অংশগুলোয় ঢুকতে মন চাচ্ছে না।। তাই গুহা দেখাটা বাতিল করে দিলাম। ঠিক করলাম, পরে কখনো গুহা দেখার শখ উঠলে এই জাতীয় উদ্যানে এসে ঘুরে যাব।
বিকেল ছয়টা নাগাদ আমরা কেইভ সিটিতে পৌঁছলাম। মোটেলের কাছাকাছি এসে মনে পড়ল, আরে! কেন্টাকিতেই তো কেএফসি বা কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেনের জন্ম। ১৯২৯-৩০ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ংকর অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, তখন হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স নামে কেন্টাকির একজন অধিবাসী ভাজা মুরগীর দোকান খুলে বসেন। সে সময় হ্যামবার্গার ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড। স্যান্ডার্সের মুরগী ভাজা হ্যামবার্গারের সেই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বসল। বাকিটা ইতিহাস। আপনারা হয়ত দেখেছেন, স্যান্ডার্সকে কর্নেল স্যান্ডার্স নামে ডাকা হয়। মজা হল, স্যান্ডার্সের নামের আগে যে কর্নেল উপাধিটা বসে, সেটা কোনো বাহিনীর দেওয়া উপাধি নয়। এটা কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান। কেন্টাকির অধিবাসী হিসেবে স্যান্ডার্স এই উপাধি পেয়েছেন। তো, কেন্টাকিতে এসে কেএফসি থেকে না খেলে চলে? এমনিতে আমার কেএফসির মুরগী মোটেও পছন্দ নয়। সেন্ট লুইস আর বাটলার, দুই জায়গা থেকেই খেয়ে দেখেছি। এবার জন্মস্থানেরটা খেয়ে দেখি পছন্দ হয় কিনা। অনেক আশা নিয়ে কুড়মুড়ে মুরগী ভাজার একটা বাকেট কিনলাম। কিন্তু আশায় গুড়েবালি। সেন্ট লুইস, বাটলার, কেইভ সিটি, সব চিকেনেরই ফালতু স্বাদ। বাংলাদেশের ঢাকা শহরে বিএফসির যে মুরগী ভাজা আছে, সেগুলোকে ইউএসের কোনো ফাস্টফুড চেইন টেক্কা দিতে পারবে না। আমার খাওয়া শ্রেষ্ঠ ফ্রায়েড চিকেন হল বিএফসির চিকেন। কেউ একমত হলে আওয়াজ দিবেন। একমত না হলে অবশ্য মার দেওয়ার কিছু নেই।