0 0
Read Time15 Minute, 43 Second
স্ফিংস নামটা শুনলে সবার আগে মাথায় আসে গিজায় অবস্থিত স্ফিংসের মূর্তির কথা। এই মূর্তিটা এতোই জনপ্রিয় যে, বেশিরভাগ মানুষ স্ফিংস নামক পৌরাণিক প্রাণির সাথে পরিচিতই হয় এই মূর্তির মাধ্যমে। চলুন জেনে নিই স্ফিংস সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক তথ্য।
পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত স্ফিংসঃ মিশরের গিজা নামক জায়গায় অবস্থিত স্ফিংস
স্ফিংসের আসল প্রতিকৃতি এসেছে মিশর বা ইথিওপিয়া থেকে। কিন্তু গ্রিক ইতিহাসের সাথে জড়ানোর পর এর প্রতিকৃতিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। যেমন, মিশরীয় স্ফিংসের শরীরটা হয়ে থাকে সিংহের এবং এর দেহের দু’পাশে কোনো পাখা নেই। এর মাথা হয় মানুষের, এবং মিশরীয় স্ফিংসকে সাধারণত পুরুষ হিসেবেই গণ্য করা হয়। একে সবসময় থাবা গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় দেখা যায়। সবশেষে, এই স্ফিংস হলো দয়ালু মনোভাবের, যদিও তার দেহে আছে প্রচণ্ড শক্তি।
মানুষের মাথা সম্বলিত মিশরীয় স্ফিংস। এটিই মিশর সভ্যতায় স্ফিংসের সবচেয়ে প্রচলিত প্রতিমূর্তি।
অপরদিকে, গ্রিক স্ফিংসের দেহ সিংহের হলেও দেহের দু’পাশে পাখির মত ডানা আছে। দেহের উপরের অংশে নারীদেহের আদলে স্তন এবং চেহারা দেখা যায়। এর একমাত্র ভঙ্গি থাবা গেড়ে বসে থাকা নয়, বরং ভাস্কর আর চিত্রশিল্পীদের ইচ্ছানুযায়ী আমরা একে বিভিন্ন পজিশনে দেখতে পাই। একই কারণে, অর্থাৎ ভাস্কর আর চিত্রশিল্পীদের বাঁধহীন কল্পনার খেসারত হিসেবে গ্রিক স্ফিংসের দেহে সাপ আকৃতির লেজও দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে মূল শারীরিক বৈশিষ্ট্যের তুলনায় একদম ভিন্ন চিত্রও আপনারা দেখতে পাবেন। যেমন, দেহের উপরের অংশ হলো সিংহের মত, নিচের অংশ পুরুষের মত, তাতে আবার শকুনের থাবা বসানো, আর ঈগলের ডানা-যুক্ত।
গ্রিক স্ফিংসকে প্রধানত মহিলা হিসেবেই ধরা হয়। কারণ গ্রিক পুরাণে উল্লিখিত স্ফিংস ছিলো অর্থাস এবং একিদনা বা অর্থাস এবং কাইমেরার কন্যা। এই স্ফিংস ছিলো প্রচণ্ড শক্তিমান, এবং এর মনোভাব ছিলো অত্যন্ত হিংস্র। চরিত্রের দিক থেকে এটা ছিলো মিশরীয় স্ফিংসের পুরোপুরি বিপরীত! ছিলো প্রতারক এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির।
গ্রিসের ডেলফি নামক অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন গ্রিক স্ফিংস। মিশরীয় স্ফিংসের তুলনায় অনেকটুকুই ভিন্ন।
১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে গ্রিসে সর্বপ্রথম স্ফিংসের মূর্তি দেখা যায়। তখনই স্ফিংসের দেহে ডানার আবির্ভাব ঘটে। বলতে পারেন, গ্রিকরা এই দেবতা বা দেবীর বিষয়ে কোথা থেকে জেনেছিলো? মিশর থেকে নয়, ইথিওপিয়া থেকে নয়, বরং এশিয়া থেকে। আর এশিয়রা জেনেছিলো মিশরীয়দের কাছ থেকে। প্রাচীন গ্রিক লেখক হেসিওড তার লেখায় “Phix” নামক একটি প্রাণির কথা উল্লেখ করেছেন। এটাই আমাদের আজকের Sphinx। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর থেকে গ্রিস চিত্রকলা থেকে স্ফিংসের অস্তিত্ব যেন এক প্রকার হারিয়েই যায়। প্রায় চারশো বছর ধরে এই অদ্ভুত হাহাকার বজায় ছিলো, যদিও এশিয়ায় ঠিকই স্ফিংসের ঠাঁটবাট বজায় ছিলো। যখন গ্রিক শিল্পকলায় স্ফিংস ফিরে এলো, তখন দেখা গেলো, এটি মেয়ের রূপ ধরে ফিরে এসেছে। মাথায় করে নিয়ে এসেছে লম্বা পরচুলার মতো একটা অংশ।
৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মার্বেল পাথরে নির্মিত স্ফিংস
রেনেসাঁ আমলে প্রকৃত মিশরীয় অবয়ব থেকে স্ফিংসের চেহারা আরও অনেকখানি সরে আসে। কারণ সে সময় পুরো ইউরোপ জুড়ে শিল্পীরা নিজের কল্পনার রঙে সাজিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করতে শুরু করেন। তারা নব জাগরণের বৈশিষ্ট্য হিসেবে মূল চেহারার উপর নিজস্ব কল্পনা প্রয়োগ করেন।
রেনেসাঁ আমল পরবর্তী সময়ে Gustave Moreau অঙ্কিত “স্ফিংস আর অডিপাস”, সময়কাল ১৮৬৪
কিন্তু এই সময়ের পরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আবার মূল অবয়বের সাথে মিল রেখে স্ফিংসের চেহারা দেখা যেতে লাগলো। তবে বিভিন্ন দেশে স্ফিংসের চেহারা, কাজকর্ম, স্বভাব ইত্যাদিতে ভিন্নতা দেখা যায়। কারণ প্রায় প্রতিটা দেশই নিজস্ব ইতিহাস আর ঐতিহ্য অনুসারে স্ফিংসকে কল্পনা করে নিয়েছে। সবচেয়ে পুরানো স্ফিংসের মূর্তিটি পাওয়া গেছে তুরস্কের Gobekli Tepe নামক জায়গায়, যে মূর্তিটি স্থাপিত হয়েছিলো খ্রিস্টেরও জন্মের ৯,৫০০ বছর আগে!

স্ফিংসের বসবাস কোথায় ছিলো? স্ফিংসের কাজই বা কী ছিলো?

পৃথিবী বিখ্যাত মিশরীয় স্ফিংসগুলো অবশ্যই মিশর দেশে বাস করতো। এই স্ফিংসগুলোকে দেখা যায় বিভিন্ন ফারাওয়ের সমাধি সৌধে। অনুমান করা হয়, স্ফিংসের মাথাগুলো নির্মিত হতো যে ফারাওয়ের সমাধি সে পাহারা দিচ্ছে, সে ফারাওয়ের চেহারা অনুযায়ী। যেমন, ফারাও খাফ্রে’র আদল অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে গিজার গ্রেট স্ফিংসের মাথা। আবার মিশরের প্রথম স্ফিংসটি নির্মিত হয়েছিলো রাণী দ্বিতীয় হেটেপিরিস-এর আদলে। ফারাও হাসেপ্সুট-এর আদলে নির্মিত স্ফিংসও অনেক বিখ্যাত।
ফারাও হাসেপ্সুট-এর আদলে গ্রানাইট পাথরে নির্মিত স্ফিংস
গ্রিক স্ফিংসগুলোর বসবাস ছিলো থিবিস নগরীর প্রবেশদ্বারে। কারণ তারা পাহারা দিতো এই ফটককে। কোনো পর্যটক বা আগন্তুক বা পথচারী বা ভ্রমণকারী যদি থিবিস নগরে ঢুকতে চাইতো, তাহলে স্ফিংস তাদেরকে একটা ধাঁধাঁ সমাধান করতে দিতো। যে ধাঁধাঁর সঠিক জবাব দিতে পারতো, সে থিবিসে প্রবেশ করতে পারতো। আর যে ফেল মারতো, তাকে স্ফিংস হত্যা করে খেয়ে ফেলতো। মিশরীয় এবং গ্রিক – উভয় সভ্যতার স্ফিংসই সমাধিক্ষেত্র এবং মন্দিরের প্রবেশপথে রক্ষকের কাজ করতো। তাই স্থাপত্য শিল্পেই স্ফিংসের ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

স্ফিংসের ধাঁধাঁ

পৌরাণিক এই প্রাণির বিখ্যাত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে তার অদ্ভুত অবয়ব। কিন্তু গ্রিক পুরাণের স্ফিংস তার ধাঁধাঁর কারণেও বিখ্যাত হয়ে আছে। থিবিস নগরীর প্রবেশ পথের সামনে কোনো অনাহূত এসে যদি ভেতরে ঢুকার অনুমতি চাইতো, তাহলে পাহারাদার স্ফিংস একটা ধাঁধাঁ জিজ্ঞেস করতো। তা হলো, “কী সেই জিনিস, যার কণ্ঠস্বর মাত্র একটা, কিন্তু সে সকালবেলায় হাঁটে চার পায়ে, দুপুরে দুই পায়ে, আর রাতে তিন পায়ে?” এই ধাঁধাঁটি তাকে শিখিয়েছিলেন কলা এবং বিজ্ঞানের দেবী “মিউজ”। মিউজ আসলে একজন দেবী নন, তারা ছিলেন নয়জন বোন। সবাই-ই যিউস এবং নেমোসিন (বারোজন টাইটানের একজন)-এর কন্যা। ধাঁধাঁর উত্তর যদি কেউ দিতে না পারতো, তবে স্ফিংস তাকে মেরে কেটে (রান্না করতো কিনা জানি না) খেয়ে ফেলতো। আর আমাদের জন্য দুঃখের হলেও স্ফিংসের জন্য সুখের বিষয় হলো, কেউই তার ধাঁধাঁর সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।
উম… না, একজন… একজন মানুষ পেরেছিলেন। তিনি হলেন অডিপাস। ধাঁধাঁর সঠিক উত্তর দিয়ে তিনি থিবিস নগরে প্রবেশের অধিকার পেয়েছিলেন। পরে হয়েছিলেন থিবিসের রাজা।
তিনি বলেছিলেন, “তোমার ধাঁধাঁর খ্যাঁতা পুড়ি। এর জবাব হলো – মানুষ। কারণ একজন মানুষের কণ্ঠ একটাই। কিন্তু সে ছোটবেলায় হাঁটতে শেখে হামাগুড়ি দিয়ে, দুই হাত আর দুই পা দিয়ে। বড় হলে হাঁটে দুই পা দিয়ে। আর বৃদ্ধ হলে দুর্বল দুটো পা-কে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজন হয় একটা লাঠির। ফলে হয়ে যায় তিনটে পা।”
স্ফিংসের ধাঁধাঁর উত্তর দিচ্ছেন অডিপাস
সঠিক জবাব শুনে স্ফিংসের নিশ্চয় খুব রাগ উঠেছিলো! কারণ সে আরেকটা কঠিন ধাঁধাঁ জিজ্ঞেস করে বসেছিলো অডিপাসকে। “দুইজন বোন আছে। প্রথমজন জন্ম দেয় দ্বিতীয়জনকে। একইভাবে দ্বিতীয়জনও জন্ম দেয় প্রথমজনকে। বল ব্যাটা, কে এই দুই বোন!” স্ফিংসকে ক্লিন বোল্ড করে অডিপাস এই ধাঁধাঁরও সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এই দুই বোন হলো রাত আর দিন।”
যাহ্‌ বাবা! রাত আর দিন দুই বোন? হ্যাঁ পাঠক, আমার-আপনার বাংলা ভাষায় এরা সহোদরা না হলেও গ্রিক ভাষায় “রাত” আর “দিন” – দুটোই স্ত্রীলিঙ্গ। তাই এদের অন্তত “ভাই” হওয়ার সম্ভাবনা নাই।
বুঝতে পারছেন, এরপর স্ফিংসের মেজাজটা কেমন হয়েছিলো? নিশ্চয় আত্মসম্মানেও লেগেছিলো প্রচুর। এজন্যেই সে নিজেই নিজেকে হত্যা করে ফেললো। আর এই আত্মহত্যা কীভাবে হয়েছিলো, সে বিষয়ে আছে দুটো মতামতঃ এক, যে পাথরের উপর স্ফিংস বিশ্রাম নিতো, সেই পাথরের উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে সে আত্মহত্যা করে; দুই, নিজেই নিজেকে খেয়ে ফেলে আত্মহত্যা করে (এটা কীভাবে সম্ভব? ধাঁধাঁর জবাব দেন!)
আঠারোশো শতাব্দীর মধ্যভাগে স্পেনে নির্মিত স্ফিংসের মূর্তি “La Granja”
ইতিহাসে মোটামুটি গণহারে অডিপাসের কাছে স্ফিংসের পরাজয় নিয়ে ফুলদানি বা মাটির পাত্রে বিভিন্ন দৃশ্য আঁকা হয়েছিলো। তবে কিছু চিত্রে দেখা যায়, অডিপাস অস্ত্র নিয়ে স্ফিংসের সাথে লড়াই করছেন। এ থেকে ধারণা করা হয়, কোনো এক সময়ে হয়ত দুজনের মধ্যে মানসিক যুদ্ধের বদলে শারীরিক যুদ্ধের ব্যাপারেই মানুষ বিশ্বাস করতো। তবে অডিপাসের কাছে স্ফিংসের এই হেরে যাওয়া কিন্তু আরেকটা রূপকধর্মী অনুমানেরও সূচনা করে। সেটা হলো, স্ফিংসের ধ্বংসের মাধ্যমে আদতে প্রাচীন ধর্মীয় রীতিনীতিরই অবসান ঘটে। আর অডিপাসের জয়ের মাধ্যমে অলিম্পাস পর্বতে অধিষ্ঠানরত নব্য দেবতাদের যুগ শুরু হয়।
অ্যাসিরিয়া রাজ্যের প্রতিরক্ষা দেবতা “লামাসু”। অনুপ্রাণিত হয়েছে স্ফিংস থেকে। তাই চেহারায় ভিন্নতা থাকলেও মিলটুকুও ঢাকা পড়েনি। নির্মাণকালঃ ৭২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
ফরাসি লেখক জ্যঁ ককতুঁ তার রচনায় স্ফিংস আর অডিপাসের কাহিনি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি লিখেন, স্ফিংস অডিপাসকে ধাঁধাঁ জিজ্ঞেস করে উত্তর পাওয়ার আশায় বসে থাকেনি। বরং নিজেই উত্তরটা দিয়ে দিয়েছিলো যেন সে আত্মহত্যা করতে পারে। কারণ নিজ হাতে আর কোনো মানুষ মারার ইচ্ছে তার হচ্ছিলো না। ককতুঁর কাহিনি আরেকটু প্যাঁচ খায় যখন তিনি বলেন, স্ফিংসের এই সিদ্ধান্তের কারণে অডিপাস স্ফিংসের প্রেমে পড়ে যায়। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, অডিপাসের কাছে স্ফিংসের ধাঁধাঁ ছিলো, “সন্তানেরা কোথা থেকে আসে?” তবে এইসব ধাঁধাঁর কারণে স্ফিংস সম্পর্কিত আরেকটা লিজেন্ড প্রচলিত হয়ে গিয়েছিলো। লিজেন্ডটা হলো, পৃথিবীতে এমন কিছু নেই, যা স্ফিংস জানে না। অর্থাৎ “সবজান্তা” বিশেষণটির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হতে পারেন আমাদের স্ফিংস।
নোট শেষ করার আগে শেষ চমকটা দিয়ে যাই।

এটা হলো ভারতের চিদাম্বরম মন্দিরের প্রবেশ পথে পাহারারত “পুরুষামৃগ” বা ভারতীয় স্ফিংস!
তথ্যসূত্রঃ
Dictionary of Greek and Roman Biography and Mythology.
Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে আনার/করে আসার জন্য কিছু জিনিসের তালিকা
Next post খোঁজাখুঁজি সিরিজঃ পেগাসাস