পেগাসাস নামটা পরিচিত লাগছে কি? ছোটবেলায় পেগাসাস শুজ নামে একটা জুতার বিজ্ঞাপন দেখতাম। এরপর কিশোরবেলায় জানলাম, গ্রীক পুরাণের একটি চরিত্র হল পেগাসাস নামক ঘোড়া। আরও পরে বুঝলাম, বাংলা রূপকথায় যে পঙ্খীরাজ বা পক্ষীরাজ ঘোড়ার কথা বলা হয়, সেটা পেগাসাসেরই বাংলা ভার্সন! আজ চলুন পড়ি ডানাওয়ালা এক ঘোড়ার গল্প, যাতে সওয়ার হয়ে ছোটবেলায় ডালিম কুমার আর বেদানা কুমারীর চরিত্রে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমরা।
দানবী মেডুসা এবং দেবতা পসাইডনের (সাগর আর ঘোড়ার দেবতা) সন্তান হল পেগাসাস। সাদা রঙের বিখ্যাত এই পশুর জন্মের প্রক্রিয়া মানুষের মত মামুলি হবে, তাই কি হয়? তাই আজব এক ঘটনার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল উড়ন্ত এই ঘোড়া।
তরুণ গ্রীক বীর পার্সিয়াস এক কঠিন সংকল্প হাতে নিয়েছিল – বীভৎস দানবী মেডুসাকে হত্যা করার। কিন্তু কে এই মেডুসা? মেডুসা হল গ্রীক পুরাণের সেই চরিত্র, যার মাথায় চুলের বদলে সাপ কিলবিল করত। সে দেখতে এতই কুৎসিত ছিল যে, কেউ ওর চোখের দিকে তাকালেই পাথরে পরিণত হত। কেন তার এই হাল হয়েছিল, সে আরেক গল্প। অনেক বছর ধরে পার্সিয়াস মেডুসাকে খুঁজে বেড়াল। শেষমেশ যখন পেল তখন দেখল, মেডুসা তার দুই বোনকে (একত্রে তিন বোনকে গর্গন বলে) নিয়ে কিছু পাথুরে মূর্তির মাঝে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। এগুলো হল সেইসব বীরের মূর্তি, যাদের মেডুসা তার ভয়ঙ্কর চাহনী দিয়ে পাথর বানিয়েছিল। কিন্তু অন্যান্য দেবতার সাথে আলোচনা করে পার্সিয়াস জেনে এসেছিল মেডুসা বধের কৌশল। তাই সে সরাসরি মেডুসার দিকে না তাকিয়ে মসৃণ এক ঢালের মাধ্যমে মেডুসাকে দেখল। ফলে মেডুসার যাদু পার্সিয়াসকে বশ করতে পারল না এবং পার্সিয়াস একটা কাস্তে দিয়ে ওর কদাকার মাথাটা কেটে ফেলল। মেডুসার কাটা ঘাড় দিয়ে যখন গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগল, তখন সে রক্ত থেকেই জন্ম নিলো পেগাসাস ঘোড়া আর তার মানুষ ভাই – খ্রিসাওর।
মেডুসার মৃত্যু দেখে বাকী দুই বোন ক্রোধে পাগল হয়ে পার্সিয়াসকে ধাওয়া করলো। কিন্তু পেগাসাস তার পিঠে চড়ার জন্য পার্সিয়াসকে অনুমতি দিলে, দুজনে মিলে নিরাপদ গন্তব্যে পালিয়ে যেতে পেরেছিল। কবি হেসোয়েডের মতে, পেগাসাস নামটা এসেছে pegai (ঝর্ণা) এবং Okeanos (যে জায়গায় পেগাসাস জন্মেছিল) থেকে। ১৯৫২ সালে উদ্ভূত আরেক সূত্রমতে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা “Luwian”-এ pihassas মানে বিদ্যুৎ। সেখান থেকেই পেগাসাস নামের উৎপত্তি। কারণ জিউস পেগাসাসকে করেছিলেন বজ্র আর বিদ্যুতের বাহক।
পার্সিয়াসের মৃত্যু পর্যন্ত পেগাসাস তার সেবা করেছে। এরপর সে মিউজদের (Muses হলেন নয়জন বোন, যারা শিল্পকলা, সঙ্গীত এবং বিজ্ঞানের দেবী) বাসস্থান হেলিকন পর্বতে যায়। সেখানে যে পবিত্র ঝর্ণাটি মিউজদের কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগাতো, সেটা শুকিয়ে গিয়েছিল। পেগাসাস তার খুর দিয়ে একটা পাথরের উপর এত জোরে আঘাত করে যে, পাথর ভেঙে ঝর্ণার সৃষ্টি হয়। ঝর্ণাটির নাম হিপোক্রিন। কথিত আছে, যারা এই ঝর্ণার পানি খেত, তারা কবিতা লেখায় পারদর্শী হয়ে উঠত।
মানুষের হাতে সহজে বশীভূত হওয়ার বান্দা পেগাসাস নয়। তারপরও যে দুজন বীর একে বশীভূত করে পিঠে উঠতে পেরেছিল, তারা হল পার্সিয়াস এবং বেলেরোফন। পার্সিয়াসের কথা আগেই জেনেছি। এবার জানবো দেবতা পসাইডনের আরেক পুত্র গ্রীক বীর বেলেরোফনের কাহিনী। সে কীভাবে ঠাণ্ডা করেছিল পরাক্রমশালী এই পশুকে, সে কাহিনী।
কথিত আছে, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা পলিআইডোস বেলেরোফনকে বলেন অ্যাথেনা দেবীর মন্দিরে গিয়ে ঘুমাতে। সেখানে রাতের বেলা দেবী বেলেরোফনের কাছে আসেন এবং তাকে একটা সোনার তৈরি লাগাম উপহার দেন। পরদিন সকালে লাগাম হাতে নিয়েই বেলেরোফন পেগাসাসকে খুঁজতে বের হয়। পেগাসাস তখন মিউজদের পবিত্র ঝর্ণা ‘পিয়েরিয়ান’ থেকে পানি খাচ্ছিল। এমন অবস্থায় বেলেরোফন ঘোড়াটিকে পাকড়াও করে আর ধীরে ধীরে তাকে শান্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর পেগাসাস বেলেরোফনকে তার সওয়ার হতে অনুমতি দেয়। পেগাসাসে চড়ে বেলেরোফন কুখ্যাত দানব কাইমেরাকে হত্যা করতে রওনা হয় এবং বিখ্যাত সেই যুদ্ধে জয়ী হয়। কাইমেরা ছিল আদতে একটি সিংহ, যার পিঠ ফুঁড়ে বের হয়েছে ছাগলের মাথা আর লেজের শেষে আছে সাপের মুখ।
গৌরবান্বিত এই জয়ের পর বেলেরোফন নিজেকে দেবতাদের সমতুল্য ভাবতে শুরু করে। সে পেগাসাসকে জোর করতে থাকে তাকে অলিম্পাস পর্বতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পেগাসাস রাজী হয় বটে, কিন্তু বেলেরোফনের এই ঔদ্ধত্য দেবতাদের রাগিয়ে দেয়। জিউস একটা মাছি পাঠান পেগাসাসকে কামড়ানোর জন্য। মাছির কামড়ের চোটে পেগাসাস পিছু হটে বেলেরোফনকে সজোরে ছুঁড়ে মারে মাটিতে। এর ফলে গ্রীক বীর চিরকালের মত পঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু পেগাসাস ঠিকই অলিম্পাসের দিকে উড়ে যেতে থাকে আর একসময় পৌঁছে যায় সেখানে।
অলিম্পাস পর্বতে পৌঁছানোর পর পেগাসাসকে ইওসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ইওসের কাজ ছিল আকাশের বুক থেকে রাত হটিয়ে ভোর নিয়ে আসা। পেগাসাস জিউসের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের পিঠে করে বজ্র আর বিদ্যুৎও সরবরাহ করত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পেগাসাস অলিম্পাসেই জিউসের ফাই ফরমাশ খেটে কাটিয়েছে। মৃত্যুর পর জিউস তাকে নক্ষত্রপুঞ্জে পরিণত করেন আর আকাশে ঠাঁই দেন।
পেগাসাস ছিল দয়ালু আর সাহায্যকারী। এর কোন লোভ ছিল না। তবে পেগাসাসের প্রতীক সময়ের সাথে সাথে বদলেছে। মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁ পর্যন্ত একে ভাবা হত জ্ঞান আর খ্যাতির প্রতীক। ঊনিশ’শো শতাব্দীতে এসে সে হয়ে গেল কবিতার প্রতীক। তার খুরের আঘাতে যেসব পানির উৎস সৃষ্টি হত, সেগুলো থেকে পান করলে কবিতা লেখার উৎসাহ জন্মাত।
পেগাসাসের নামে একটি নক্ষত্রপুঞ্জের নামকরণ করা হয়েছে, যেটা আপনি খালি চোখেই দেখতে পাবেন। এটি উত্তর আকাশে অবস্থিত।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর গ্রীক মৃৎশিল্পে, বিশেষ করে করিন্থ শহরের পণ্যসামগ্রীতে পেগাসাসের অনেক প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে করিন্থের মুদ্রায়ও পেগাসাসের নকশা খোদাই করতে দেখা গেছে। রোমান চিত্রকলার ক্ষেত্রেও বেলেরোফন আর পেগাসাসের কাহিনী অনেক জনপ্রিয় একটি বিষয় ছিল। রেনেসাঁ আমলের অনেক ভাস্কর্যেও পেগাসাসকে পাওয়া যায়।
যদিও পুরাণে পেগাসাসের চরিত্রটির ব্যাপ্তি খুব ছোট, পার্সিয়াস আর বেলেরোফনের বাহক হওয়া এবং জিউসের জন্য বজ্র সরবরাহ করা ছাড়া তার কাজকর্ম সম্পর্কে তেমন উল্লেখ নেই, তবুও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি চরিত্র। সেই প্রাচীন গ্রীসের মৃৎশিল্প থেকে শুরু করে আজকালকার কর্পোরেট লোগোতে পর্যন্ত পেগাসাসের অবয়ব দেখা যায়।
* http://www.theoi.com/Ther/HipposPegasos.html
* http://www.ancient.eu/Pegasus/
* Homer’s Iliad (c. 800-600 BC)
* উইকিপিডিয়া