Read Time22 Minute, 7 Second
গ্রিক পুরাণ অনুসারে হার্মোনিয়া ছিল সামঞ্জস্য আর ঐকতান বজার রাখার দেবী। পৃথিবীতে যেন বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্য সৃষ্টি না হয়, সে দায়িত্ব ছিল হার্মোনিয়ার উপর। কিন্তু তার জীবনে এসেছিল এমন এক অলংকার, যার কারণে ভালোরকম নৈরাজ্য তৈরি হয়েছিল দুনিয়ায়। হার্মোনিয়া হয় যুদ্ধের দেবতা অ্যারিস আর ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতির কন্যা ছিল, অথবা দেবরাজ যিউস আর মানবী ইলেক্ট্রার কন্যা ছিল। হার্মোনিয়ার ঠিক বিপরীত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গ্রিক দেবী ছিল ইরিস, যার কাজ ছিল বিশৃঙ্খলা তৈরি করা। তাই তাকে বলা হয় নৈরাজ্যের দেবী। আবার রোমান পুরাণে শৃঙ্খলার দেবী হিসেবে দেখা যায় কনকর্ডিয়াকে, আর কনকর্ডিয়ার বিপরীত হিসেবে উল্লেখ আছে দেবী ডিসকর্ডিয়ার নাম। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, ইংরেজিতে Harmony আর Concord মানে ঐকতান বা শৃঙ্খলা, আর Discord মানে বিশৃঙ্খলা। ডিম আগে না মুরগি আগের মত প্রশ্ন রাখলাম, দেবীদের নাম আগে এসেছে, নাকি ইংরেজি শব্দগুলো?
হার্মোনিয়ার বিয়ে হয়েছিল বীর ক্যাডমাসের সাথে, যে ছিল প্রাচীন গ্রিসের থিব্স (Thebes) নামক রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠার পর থিব্সের প্রথম রাজাও হয়েছিল ক্যাডমাস। হার্মোনিয়া আর ক্যাডমাসের ছিল ছয় সন্তান, যাদের মধ্যে সেমেলি, আইনো এবং অটোনো অন্যতম। এই তিন কন্যার গল্প হবে কিছুক্ষণ পর। হার্মোনিয়ার আরেকটা পরিচয় পাওয়া যায় অ্যাপোলোনিয়াসের বর্ণনা থেকে। তিনি বলেছেন, হার্মোনিয়া ছিল একজন নিম্ফ (প্রাকৃতিক নানা উপাদান যেমন সমুদ্র, বন জঙ্গল ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণকারী দেবী, যারা পদমর্যাদায় মূল দেবীদের নিচের স্তরে ছিল) যে অ্যাকমোনিয়া নামক এলাকায় অবস্থিত বন জঙ্গল দেখাশোনা করত। সে ছিল যুদ্ধের দেবতা অ্যারিসের প্রেমিকা। দুজনের ভালোবাসার ফল হিসেবে জন্ম নিয়েছিল দুর্ধর্ষ অ্যামাজন বাহিনী, যে বাহিনীর সকলেই ছিল নারী যোদ্ধা। আরেক কাহিনী থেকে জানা যায়, হার্মোনিয়া ছিল স্যামোথ্রেস নামক দ্বীপের অধিবাসী। ক্যাডমাস যখন স্যামোথ্রেস ভ্রমণে গিয়েছিল, তখন হার্মোনিয়াকে দেখে মুগ্ধ হল। এরপর দেবী অ্যাথেনার সাহায্যে তাকে নিয়ে এল নিজের রাজ্য থিব্সে।
হার্মোনিয়া সম্পর্কে মোটামুটি জানা গেল। এবার চলুন জানি হার্মোনিয়ার গলার হার সম্পর্কে। এটা জানার জন্য আমাদের তাকাতে হবে পিছু ফিরে, হার্মোনিয়ার জন্মের আগের কাহিনীতে। দেবী আফ্রোদিতি ছিল কামারশিল্পের দেবতা হেফাস্তুসের বউ। কিন্তু আফ্রোদিতির গোপন সম্পর্ক ছিল দেবতা অ্যারিসের সাথে। হেফাস্তুস যখন ব্যাপারটা টের পেল তখন ক্ষুব্ধ আর অপমানিত হয়ে ঠিক করল, প্রতিশোধ নেবে। আফ্রোদিতি আর অ্যারিসের প্রেমের ফলে যদি জন্ম নেয় কোনো সন্তান, তবে তারা চিরজীবনের জন্য হেফাস্তুসের অভিশাপ বয়ে চলবে। দেখা গেল, আফ্রোদিতি আর অ্যারিসের একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়ের নাম রাখা হল হার্মোনিয়া। ক্যাডমাসের সাথে হার্মোনিয়ার বিয়ের দিন হেফাস্তুস হার্মোনিয়ার কাছে উপহার হিসেবে নিয়ে এল একটা কণ্ঠহার। এত সুন্দর হার এর আগে কেউ দেখেনি। দেখবেই বা কীভাবে? এ কি মর্ত্যের মানুষের তৈরি? এ তো স্বয়ং হেফাস্তুসের নিজ হাতে গড়া অলংকার!

সোনা পিটিয়ে পাত করে হারটা বানানো হয়েছে। সাথে আছে নানা ধরনের রত্ন। নকশাও একদম অন্যরকম। সোনার তৈরি দুটো সাপ খোলা মুখে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে। একই সাথে ভয়াল দর্শন, আবার চোখ ফেরানো যায় না ধরনের সৌন্দর্য। হারটা দেওয়ার আগে হেফাস্তুস সেটাকে অভিশাপ দিয়ে নিল। এই হার যার কাছে থাকবে বা যে এই হার পরবে, তার জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ। মজার ব্যাপার হল, অভিশাপের সাথে হারের একটা গুণও ছিল। এটা যে পরবে, সে পাবে অমর যৌবন আর অমর সৌন্দর্য। সে কখনো বুড়িয়ে যাবে না, তার সৌন্দর্য হবে না মলিন। ফলে এই হারের গল্প চাউর হতে বেশি সময় লাগল না। থিব্সের সব নারীর আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হল হার্মোনিয়ার গলার হার।
রাজ্য শাসনের এক পর্যায়ে ক্যাডমাস বাধ্য হল থিব্স ছেড়ে চলে যেতে। তখনও কেউ বুঝেনি অভিশপ্ত কণ্ঠহারের খেলা কেবল শুরু। হার্মোনিয়া জামাইয়ের সঙ্গ নিল। দুজনে যখন এন্চেল নামক এলাকায় এসে পৌঁছল, দেখল সেখানকার স্থানীয়রা ইলিরিয়া নামক রাজ্যের অধিবাসীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। দুজনে মিলে এন্চেলের হয়ে লড়ল আর যুদ্ধে জিতল। ক্যাডমাস ইলিরিয়ার রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসল। কিন্তু একদিন বলা নেই, কওয়া নেই, ক্যাডমাস একটা সাপে পরিণত হল। শুরু হল অভিশাপের দ্বিতীয় পর্যায়। হার্মোনিয়া ক্যাডমাসের এই অবস্থা দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। রাগে দুঃখে নিজের জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলল। তারপর পানির বদলে মদিরা ঢেলে তৈরি করা একটা কুণ্ডে নামল। নেমে সাপটাকে আমন্ত্রণ জানাল নিজের কাছে। হার্মোনিয়ার ভালোবাসার ক্যাডমাস, হোক না সে সাপ! সাপটা যখন হার্মোনিয়ার কাছে এল, পেঁচিয়ে ধরল হার্মোনিয়ার শরীর, তখন দেবতারা এই দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। তারা হার্মোনিয়াকেও পরিণত করল সাপে। তারপর সর্প দম্পতিকে ড্রাগন টানা রথে চড়িয়ে নিয়ে গেল স্বর্গোদ্যানে। বাকি জীবন হার্মোনিয়া আর ক্যাডমাস সাপ হয়েই স্বর্গে বসবাস করল।

সাপটা হার্মোনিয়ার কাছে এল, পেঁচিয়ে ধরল হার্মোনিয়ার শরীর
হার্মোনিয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে তার কন্যা সেমেলি পেল কণ্ঠহারটা। সেমেলি বেচারা যেদিন হারটা গলায় পরল, সেদিনই দেবরাজ যিউসের সাথে ওর গোপন প্রণয়ের কথা জেনে গেল যিউসের বউ দেবী হেরা। যিউস একটা অসচ্চরিত্র দেবতা যার অসংখ্য পরকীয়ার কারণে পদে পদে বিপর্যস্ত হতে হয়েছে হেরাকে। এবারও বিপর্যস্ত হেরা একটা ফন্দি আঁটল। সেমেলিকে শাস্তি দেওয়ার ফন্দি। সেমেলিকে হেরা ফুঁসলালো যেন সে যিউসের প্রকৃত রূপ দেখার জন্য জেদ ধরে। যিউস হল বজ্রের দেবতা। তার আসল চেহারা এতই ঝলকানিযুক্ত যে, মরণশীল মানুষ সে ঝলকানি সহ্য করতে পারে না। সেমেলির তথ্যটা জানা ছিল না। সে কৌতূহলী হয়ে বারবার জিদ করতে লাগল যিউস যেন তার পূর্ণ রূপ ওকে দেখায়। জিউস প্রতিবার মানা করে দিল কিন্তু সেমেলিকে তার জেদ থেকে টলানো গেল না। অবশেষে যিউস দেবতা রূপে সেমেলির সামনে আবির্ভূত হল, আর সাথে সাথে বিদ্যুতের ঝলকানিতে সেমেলির মৃত্যু হল। সেমেলির গর্ভে ছিল যিউসের সন্তান। যিউস মৃত মায়ের গর্ভ থেকে সন্তানকে বাঁচাতে সক্ষম হল। পুত্র সন্তানটির নাম রাখা হল ডিওনিসাস।
সেমেলির বোন আইনো তার ভাগিনা ডিওনিসাসকে লালন পালন করতে লাগল। যখন বয়স হল, আইনো বিয়ে করল অ্যাথামাসকে। কিন্তু হেরা যখন দেখল যিউস আর সেমেলির অবৈধ সন্তান এখনো জীবিত, তখন রাগের চোটে আইনোর উপর প্রতিশোধপরায়ণ উঠল। পাগল বানিয়ে দিল আইনোর জামাই অ্যাথামাসকে। অ্যাথামাস মস্তিস্ক বিকৃত হয়ে খুন করতে গেল আইনোকে। আইনো জীবন বাঁচানোর জন্য গিয়ে ঝাঁপ দিল সাগরে। সাগরের দেবতা পসেইডন দয়াপরবশ হয়ে তাকে উদ্ধার করল, নতুন রূপ দিল ‘দেবী লুকোথিয়া’ হিসেবে।
আইনোর পর গলার হারটা এল সেমেলির আরেক বোন অটোনোর কাছে। অটোনোর পুত্র অ্যাক্টিয়ন বনে হরিণ শিকার করতে গিয়ে দেবী আর্তেমিসকে স্নানরত অবস্থায় দেখে ফেলল। এর শাস্তিস্বরূপ অ্যাক্টিয়নকেই হরিণ বানিয়ে দেওয়া হল। অ্যাক্টিয়নের শিকারী কুকুরগুলো অ্যাক্টিয়নকে শিকার ভেবে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। মৃত্যু হল অ্যাক্টিয়নের। হারের অভিশাপ বেশ ভালই বয়ে চলেছে। এত খারাপের মধ্যে একটা ভাল খবর হল, বড় হওয়ার পর ডিওনিসাস পাতালপুরীতে গিয়ে তার মা সেমেলিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। সেমেলি পরে নতুন জীবন শুরু করে ‘দেবী থাইয়োনি’ হিসেবে।
অটোনোর পর অনেক অনেক বছর ধরে কণ্ঠহারটা কেউ গলায় দেয়নি। কারো কব্জাতেও ছিল না সেটা। বহু বছর পর ক্যাডমাসের নাতির ছেলে রাজা লাইয়াস এই অলংকার উপহার দেয় তার বউ জোকাস্টাকে। জোকাস্টা যখন দেখল এটা তার সৌন্দর্য ম্লান হতে দিচ্ছে না, তখন হারটার প্রেমে সে অন্ধ হয়ে গেল। মোটেও হাতছাড়া করে না সে হারটা। জোকাস্টা আর লাইয়াসের যে পুত্র সন্তান হল, তার বিষয়ে ভবিষ্যৎ গণনাকারীরা এক ভয়ংকর তথ্য দিলেন। বললেন, এই ছেলে একদিন লাইয়াসকে খুন করবে, জোকাস্টাকে বিয়ে করবে, আর পুরো রাজ্যে নিয়ে আসবে বিপর্যয়। এই ভবিষ্যদ্বাণী যেন ফলতে না পারে সেজন্য জোকাস্টা আর লাইয়াস তাদের পুত্রকে একটা পর্বতে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসলেন। কিন্তু পুত্রকে ফেললে কী হবে? যে জিনিস ফেলা দরকার ছিল, সেটা তো জোকাস্টার কাছেই রয়ে গেছে!

রবার্ট ফাউলারের আঁকা ‘দা নেকলেস’
হারের অভিশাপে একসময় জোকাস্টা আর লাইয়াসের ছেলে ইডিপাস ফিরে আসে রাজপ্রাসাদে, খুন করে লাইয়াসকে। কিন্তু ইডিপাসকে কেউ চিনতে পারেনি, ইডিপাসও জানত না তার জন্মপরিচয়। ফলে লাইয়াসকে খুন করে থিব্স রাজ্য দখলের পর নিজের মা জোকাস্টাকে বিয়ে করতেও সমস্যা হয়নি ইডিপাসের। এখান থেকেই মনোবিজ্ঞানের বিখ্যাত তত্ত্ব ‘ইডিপাস কমপ্লেক্স’-এর নামকরণ করা হয়েছে। যা হোক, সত্য একসময় প্রকাশ পাবেই। ইডিপাসের সাথে অনেকগুলো বছর পার করার পর জোকাস্টা যখন জানতে পারল ইডিপাসের আসল পরিচয়, আত্মগ্লানিতে ভুগে গলায় ফাঁস দিল। ইডিপাসও বাটালি দিয়ে নিজের দুটো চোখ উপড়ে ফেলল। অন্ধ ইডিপাসকে রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য করা হল। ইডিপাস পথ প্রদর্শক হিসেবে কন্যা অ্যান্টিগোনিকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। জোকাস্টা আর ইডিপাসের ছিল চার সন্তান। দুই মেয়ে অ্যান্টিগোনি, ইস্মিনি; এবং দুই ছেলে পলিনাইসিস, ইটিওক্লিস। সবাই জীবনপথে চলতে গিয়ে অস্বাভাবিকভাবে মারা যায়। এখন বলব সেই গল্প।
ইডিপাস চলে যাওয়ার পর থিব্সের সিংহাসন ভাগাভাগি করে নিল পলিনাইসিস এবং ইটিওক্লিস। একেক বছর একেকজন সিংহাসনে বসে। একবার ইটিওক্লিস সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পরও সিংহাসন ছাড়তে রাজি হল না বরং ভাই পলিনাইসিসকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিল। পলিনাইসিস উত্তরাধিকার সূত্রে হার্মোনিয়ার কণ্ঠহারটা পেয়েছিল। সেটা নিয়ে সে আর্গোস রাজ্যে চলে গেল। রাণী ইরিফাইলিকে উপহার দিয়ে বলল, সে থিব্স রাজ্য আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। রাণী যেন রাজা অ্যাম্ফিয়ারাসকে রাজি করায় পলিনাইসিসকে সাহায্য করার জন্য। রাজা রাজি হওয়ার পর পলিনাইসিস অ্যাম্ফিয়ারাসের বাহিনী নিয়ে যুদ্ধে যায়। যুদ্ধটা ‘থিব্সের বিরুদ্ধে সাতজনের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত এবং এই যুদ্ধে পলিনাইসিস, ইটিওক্লিস দুজনেই মারা যায়। ইটিওক্লিসের মৃত্যুর পর থিব্সের নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসে জোকাস্টার ভাই ক্রেয়ন। সে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা দেয়, যারা বিশ্বাসঘাতক পলিনাইসিসের মৃতদেহ কবর দেওয়ার চেষ্টা করবে, তারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে। কিন্তু অ্যান্টিগোনি ভাইয়ের এই পরিণতি মানতে পারল না। কবর না দিলে তো ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে না! তাই সে বোন ইস্মিনি এবং মামা ক্রেয়নের সতর্কবাণী উপেক্ষা করে পলিনাইসিসকে কবর দিল। খবর শুনে ক্রেয়ন অ্যান্টিগোনিকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিল। পাহাড়ের একটা গুহার ভিতর অ্যান্টিগোনিকে মারার ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু অ্যান্টিগোনি অন্যের হাতে মরার চেয়ে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করাকেই শ্রেয় মনে করল। পুরো কাহিনীর মধ্যে ইস্মিনি বেচারার কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু বোনের মৃত্যুদণ্ড দেখে সে স্থির থাকতে পারল না। অ্যান্টিগোনির অপমানের ভাগ নেওয়ার জন্য সে বলল, দোষ তারও আছে। তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। এদিকে অ্যান্টিগোনি ছিল ক্রেয়নের পুত্র হিমনের বাগদত্তা। অ্যান্টিগোনিকে মারার আদেশ দেওয়ায় বাবার উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হল হিমন। বাবার মুখোমুখি হয়ে তাকে মারার চেষ্টাও করল। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করল। ছেলের আত্মহত্যার খবর শুনে ক্রেয়নের বউও আত্মহত্যা করল। দারুণ প্যাঁচ।
যুদ্ধে আর্গোস রাজ্যের রাজা অ্যাম্ফিয়ারাস মারা যায়। বাবাকে প্ররোচিত করে যুদ্ধে পাঠানোর দোষে দোষী সাব্যস্ত করে ইরিফাইলির ছেলে অ্যাল্কমিয়ন মাকে হত্যা করল। মা হত্যার শাস্তি দেওয়ার জন্য অ্যাল্কমিয়নকে পাতালপুরীর ‘এরিনিস’ নামক দেবীর দল ধরে নিয়ে গেল। কিন্তু পথিমধ্যে অ্যাল্কমিয়ন দলটার কাছ থেকে পালাতে সক্ষম হল। পালিয়ে সে আশ্রয় নিল ছোটখাট এক রাজ্যের চুনোপুঁটি রাজা ফেজেউসের কাছে। ফেজেউস অ্যাল্কমিয়নকে তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে পবিত্র করে তুললেন। তারপর নিজ কন্যা আর্সিনোয়ির সাথে বিয়ে দিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অ্যাল্কমিয়ন ফেজেউসকে হার্মোনিয়ার কণ্ঠহার উপহার দিল। কিন্তু অ্যাল্কমিয়ন যেহেতু মা হত্যাকারী পাপিষ্ঠ ব্যক্তি, তার উপস্থিতিতে রাজ্যের মাটি হয়ে গেল অনুর্বর। কিছু ফলে না সেখানে। পণ্ডিতরা বুদ্ধি দিল নতুন একটা ভূখণ্ড খুঁজে বের করতে যেটা কিনা অ্যাল্কমিয়ন মাকে হত্যা করার সময় পৃথিবীর বুকে ছিল না। অর্থাৎ একদম নতুন তৈরি হয়েছে। সে ভূখণ্ড হবে অভিশাপ মুক্ত। সেখানে চাষাবাদ করলে ফসল ফলবে। অ্যাল্কমিয়ন খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে অ্যাকিলাস নদীর তীরে এরকম একটা ভূখণ্ড পেল। ভূখণ্ড দখল করতে গিয়ে সে নদীর দেবতার কন্যাকে বিয়ে করে বসল। কন্যা বায়না ধরল হার্মোনিয়ার কণ্ঠহার তার চাই। ঐ কণ্ঠহার আনার জন্য অ্যাল্কমিয়ন ফেজেউসের কাছে ফেরত এল। ততদিনে ফেজেউস এবং তার পুত্ররা অ্যাল্কমিয়নের বিশ্বাসঘাতকতার কথা জেনে গেছে। অ্যাল্কমিয়নকে হাতের কাছে পেয়ে তারা এক মুহূর্ত দেরি না করে মেরে ফেলল। ঘটনা দেখে ফেজেউসের কন্যা আর্সিনোয়ি ভাইদের সাথে চরম রাগারাগি করল। বোনকে তখন তারা একটা সিন্দুকে ভরে দাসী হিসেবে বিক্রি করে দিল।
আর্সিনোয়ির পর উত্তরাধিকার সূত্রে কণ্ঠহারটা এল আর্সিনোয়ি আর অ্যাল্কমিয়নের দুই পুত্র অ্যাম্ফোটেরুস এবং আকার্নানের হাতে। এতদিনে ওরা বুঝে গেছে এই হারের সাথে কী পরিমাণ দুর্ভাগ্য জড়িত! হারটাকে নিয়ে কী করা যায় জানতে ওরা এক ভবিষ্যৎদ্রষ্টার কাছে গেল। সে বলল হারটাকে ডেলফিতে অবস্থিত দেবী অ্যাথেনার মন্দিরে দান করে দিতে। ওখানে থাকলে এটা আর কোনো মানুষের ক্ষতি করতে পারবে না। দুই ভাই তাই করল। কিন্তু মানুষ হারকে ছাড়তে চাইলেও হারটা মানুষকে ছাড়তে চায় না। এজন্য আমরা দেখি, ফাইলাস নামের এক অত্যাচারী শাসক অ্যাথেনার মন্দির থেকে হারটা চুরি করল। করে তার পরকীয়ার সঙ্গীকে দিল। সঙ্গীটি কিছুদিনের জন্য হারটা পরা শুরু করতেই তার সংসারে দেখা দিল দুর্যোগের ঘনঘটা। তার ছোট ছেলের মাথায় বিকৃতি দেখা দিল। সে বাসায় আগুন লাগিয়ে দিল, যে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল ফাইলাসের সঙ্গী এবং হার্মোনিয়ার কণ্ঠহার। এরপর ঐ হারের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।