এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ, এগারো, বারো, তেরো, চৌদ্দ, পনেরো, ষোল, সতেরো, আঠারো, ঊনিশ, বিশ
কয়েকদিন আগে এপিডেমিওলজি কোর্সের ফাইনাল প্রেজেন্টেশন দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে নিজের পছন্দের একটা এপিডেমিওলজিক্যাল রিসার্চ স্টাডি প্রেজেন্ট করতে হবে। স্টাডি কোয়েশ্চেন, মেথড, রেজাল্ট-এনালাইসিস-ডিসকাশন, কেন এই টপিক রোগতত্ত্বের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ইত্যাদি সম্পর্কে বলতে হবে। প্রফেসর বলেছিলেন নিজের ইচ্ছেমত টপিক নির্বাচন করতে পারব, তবে গবেষণাটা এনালাইটিক্যাল হতে হবে, ডেস্ক্রিপ্টিভ না। সেটাই হল ঝামেলা। মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন দাগাতে দাগাতে ওপেন এন্ডেড প্রশ্ন দেখলে এখন থতমত খেয়ে যাই। উনি যদি অনেকগুলো টপিক ঠিক করে সেগুলো থেকে আমাদের একটা বাছাই করতে বলতেন, সহজ হত। নিজেকে খুঁজতে হচ্ছে বলে দুনিয়ার কোনো জার্নালেই পছন্দসই টপিক খুঁজে পেলাম না। যে বই থেকে আমাদের পড়ানো হচ্ছিল, সেখানে খাদ্যঘটিত রোগ বা ফুড বর্ন ইলনেস নিয়ে এত মারাত্মক একটা কাহিনী পড়লাম যে, ঐ টপিকেই কথা বলব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু ঐ টপিকে যত পেপার পেলাম, সব শেষতক অণুজীব বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায় গড়াল। আমার দরকার রেট্রোস্পেক্টিভ স্টাডি। সরে আসলাম ঐ টপিক থেকে। অন্যান্য খাদ্যঘটিত রোগ নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে দুটো পেপার পেলাম। একটার কাহিনী সৌদি আরবের এক বিয়েবাড়ি নিয়ে। সেখানে খাওয়ার পর অর্ধ শতাধিক অতিথি ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়। আরেকটার কাহিনী ফিলিপাইনের এক আবাসিক এলাকার দুটো পরিবার নিয়ে। দুই পরিবারের সতেরো জন সদস্য ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়। কী খেয়ে এমন হল সেটা বের করাই গবেষকদের উদ্দেশ্য। শেষে ফিলিপাইনের পেপারটা প্রেজেন্ট করলাম।
থ্রি মিনিট থিসিসের নাম শুনেছেন নিশ্চয়? ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়েছিল এই প্রতিযোগিতা। বর্তমানে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সারা বিশ্বে। এখানে মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে আপনার গবেষণা সম্পর্কে বলতে হবে। মাত্র একটা স্লাইড ব্যবহার করতে পারবেন পুরো উপস্থাপনায়। এমনভাবে বিষয়টা উপস্থাপন করতে হবে যেন ওই টপিক সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা বা পূর্বজ্ঞান না থাকলেও সে বুঝতে পারে। সরল ভাষায়, সাধারণ মানুষের উপযোগী করে আপনার থিসিস ব্যাখ্যা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই এটার আয়োজন করে। এটা মূলত পিএইচডি শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা। কিন্তু অনেক জায়গায় মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের জন্যেও আয়োজন করা হয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন অ্যালাব্যামা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি পজিশনের জন্য ইন্টার্ভিউ দিতে গিয়েছিলাম, জীবনে প্রথমবারের মত থ্রি মিনিট থিসিস কম্পিটিশন দেখার সুযোগ হয়েছিল। সবচেয়ে ভাল লেগেছিল এক কালো মেয়ের প্রেজেন্টেশন। সে ছিল বায়োমেডিকেল সায়েন্সের পিএইচডি শিক্ষার্থী। কিছুদিন আগে টামুরও (এরা বলে ঠেম্যু বা ঠ্যামু) বার্ষিক থ্রি মিনিট থিসিসের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা হয়ে গেল। দুই ধাপে এই প্রতিযোগিতা হয়। প্রাথমিক ধাপে যে কেউ নাম লেখাতে পারে। সেখান থেকে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য প্রার্থী বাছাই করা হয়। টামুতে পিএইচডি এবং মাস্টার্স, উভয় দলের জন্যেই আয়োজন করা হয়েছিল। তবে শুধুমাত্র পিএইচডি থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার জন্য প্রার্থী পাঠানো হবে। মাস্টার্সের প্রতিযোগিতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ।
শিক্ষার্থীদের থিসিস প্রেজেন্টেশন করার দক্ষতা দেখার জন্য গিয়েছিলাম অনুষ্ঠানে। সেখানে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের প্রেজেন্টেশন আমার কাছে বেশি ভাল লাগল। সাদাদের তুলনায় এশিয়ানদেরটা বেশি ভাল লাগল। এশিয়ানরা খুব সহজ করে বলছিল, কিন্তু সাদাদের কথা আমার বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল। বিচারকদের রায়ে মাস্টার্স পর্যায়ে একজন হোয়াইট আর পিএইচডি পর্যায়ে একজন এশিয়ান বিজয়ী হল। দর্শকরা ভোট দিয়েছিল পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ডের জন্য। আমি ভোট দিয়েছিলাম দুইজন এশিয়ান মেয়েকে। পক্ষপাত করে নয়, আমার চোখে ওরাই থ্রি মিনিট থিসিসের সবগুলো ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে পেরেছিল। যা হোক, যাদের ভোট দিয়েছিলাম, তারা দেখলাম পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। তার মানে আমার একারই নয়, বেশিরভাগ দর্শকেরই ওদের প্রেজেন্টেশন ভাল লেগেছে। উপরে একজন কালো মেয়ের কথা বলেছিলাম। ঐ অভিজ্ঞতা এবং এই অভিজ্ঞতা মিলিয়ে মনে হচ্ছে সাদা বাদে বাকি প্রেজেন্টারদের উপস্থাপনাই আমার বেশি ভাল লাগে। ওরা সহজভাবে বলতে পারে। প্রেজেন্টেশনের ফাঁকে ফাঁকে দর্শকদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন কুইজ চলছিল। শেষের দিকে এসে লটারির মাধ্যমে ছয়জন দর্শককে বাছাই করা হল চূড়ান্ত একটা খেলার জন্য। ওমা! এক সময় দেখি উপস্থাপক ডাকছেন, “রুথ গশ…রুথ গশ! যেখানেই থাকুন, মঞ্চে চলে আসুন।” লটারিতে আমার নাম উঠেছে। মঞ্চে যাওয়ার পর প্রোজেক্টরের মাধ্যমে আমাদের ছয়টা ছবি দেখানো হল। এসব ছবি গুগল করে বের করতে হবে। যে আগে বের করতে পারবে, সে বেশি পয়েন্ট পাবে। আমি প্রথম দুটো ছবি আগে বের করতে পেরেছিলাম, বাকিগুলো পারিনি। ফলাফল – ফেল্টুস। যে প্রথম হল, সে এপলের বেশ কিছু উপহার বগলদাবা করে চলে গেল।
আমাদের অনুষদে হ্যালোউইন আর ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে দরজা সাজানোর প্রতিযোগিতা হয়। একে বলে ডোর ডেকোরেশন কম্পিটিশন। অক্টোবরে হ্যালোউইনের জন্য প্রতিযোগিতা হয়েছিল, কিন্তু কোনো কারণে আমি সে প্রতিযোগিতা সম্পর্কিত ইমেইল পাইনি। জানালাম গ্র্যাজুয়েট কমিটির প্রেসিডেন্টকে। সে ঠ্যালা দিল অনুষদের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে। তারা আমার ইমেইল যোগ করল ডিপার্টমেন্টের লিস্টসার্ভে। পরে যখন ক্রিসমাস ডোর ডেকোরেশনের ইমেইল দিল, সেটা পেলাম। অংশও নিলাম (নিচে ছবি)। খুবই তাড়াহুড়া করে বানানো অতি অদ্ভুত কিসিমের এই সাজ দেখে নির্বাচন কমিটির কী হাল হয়, কে জানে! ফলাফল ঘোষণা করবে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে। দেখি সান্ত্বনা পুরষ্কার জোটে কিনা। তবে আমার অ্যাডভাইজর যখন জানলেন কাগজগুলো কেটে আমিই ঘরবাড়ি, গাছপালা বানিয়েছি, খুব উৎসাহ দিলেন। বললেন, “আই অ্যাম ইম্প্রেসড!” বেচারা। আমাকে লাইনে রাখতে মুগ্ধ হওয়ার ভান করলেন মনে হয়।
ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে হলিডে উপলক্ষ্যে ডিপার্টমেন্টে লাঞ্চ পার্টি হবে। সবাইকে ইমেইলকে জিজ্ঞেস করা হল আসতে পারবে কিনা। জানিয়ে দিলাম আসব। এখানে বেশিরভাগ সময় আপনার কাছে জানতে চাইবে আপনি কোনো ইভেন্ট অ্যাটেন্ড করতে পারবেন কিনা। বিশেষ করে সেখানে যদি খাবারের ব্যবস্থা থাকে। হয়ত একটা গুগল ফর্ম পূরণ করতে দিল, বা গুগল ক্যালেন্ডারে ‘ইয়েস, মেইবি, নো’ অপশন। ব্যাপারটা ভাল লাগে। অনর্থক খাবার কিনে সেগুলো অপচয় করার মানে নেই।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ কেউ যদি আমাকে কালো মেয়ে বলতে দেখে অবাক হন, ভাবেন আমি বর্ণবাদী আচরণ করছি, তাহলে একটা জিনিস স্পষ্ট করি। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের ‘ব্ল্যাক’ বা ‘কালো’ বললে ঠিক আছে। এগুলো সম্মানজনক সম্বোধন। কিন্তু ‘নিগ্গা’, ‘নিগ্রো’, ‘কালা’, ‘কাউলা’ এসব শব্দ বলা ভুল। এগুলো অসম্মানজনক বা derogatory. (চলবে)