1 0
Read Time8 Minute, 19 Second
আইসবার্গ লেটুস

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পা দেওয়ার পর চা-খোর আমরা কোথাও খোলা চা-পাতা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যেখানেই যাই, খালি টিব্যাগ। টিব্যাগ দিয়ে কি আর দেশের মত ‘নিমিষেই গাঢ় লিকার’ পাওয়া যায়? তাই কফি খাবো ঠিক করেছিলাম। ওয়ালমার্ট থেকে বিশাল এক কৌটা কফি কিনেও আনলাম। দেশে থাকতে আমাদের দৌড় নেসক্যাফের পাঁচ টাকা দামের ইনস্ট্যান্ট কফি পর্যন্ত ছিলো। ইতালিয়ান অফিসে কাজ করার সুবাদে কালে ভদ্রে ইতালিয়ান এস্প্রেসো চাখতে পারতাম। কিন্তু সেটা বড়লোকের কফি হিসেবেই পরিচিত ছিলো। তো, বাসায় এসে কৌটা খুলে দেখি ভিতরে ইনস্ট্যান্ট কফি বলে কিছু নেই। যা আছে সেটাকে বলে গ্রাউন্ড কফি। কফির বীজ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়েছে। কফি মেকারের মাধ্যমে সে গুঁড়োকে ব্রু করে কফি বানাতে হবে। আমাদের তো মাথায় বাজ! আমরা তখন আইসবার্গ লেটুস দেখে বাঁধাকপি ভাবার স্টেজে আছি। অর্থাৎ খানাখাদ্যি নিয়ে কালচারাল শক চলছে। এমন সময় ইনস্ট্যান্ট ভেবে গ্রাউন্ড কফি কিনে আরেকটা শক খেলাম। যেহেতু কৌটার মুখ থেকে প্লাস্টিকের আবরণ খুলে ফেলেছি, তাই আর ফেরত দেওয়া যাবে না। এখন কী করি? কফি মেকার কেনা ছাড়া উপায় নেই। টাকাপয়সার টানাটানির মধ্যেই কিনে ফেললাম বারো ডলার দিয়ে মেইনস্টে ব্র্যান্ডের যন্ত্র। এই ব্র্যান্ড আমাদের বিভিন্ন সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে কম দামে ব্র্যান্ডের জিনিস কিনতে গেলে সবার আগে মেইনস্টের দিকেই নজর দিই। তো, কফি মেকার কিনে খুব জোশে ব্রু করা কফি খাওয়া শুরু করলাম। জিহ্বা এই স্বাদে এতোই অভ্যস্ত হয়ে গেলো যে এখন ইনস্ট্যান্ট কফির নাম শুনতে ইচ্ছে করে না। টানা চার বছর ধরে মেইনস্টের কফি মেকার দিয়ে কফি ব্রু করে খাচ্ছি। প্রথম প্রথম ওয়ালমার্টের নিজস্ব গ্রাউন্ড কফি কিনতাম। ওটার দাম সবচেয়ে কম। ধীরে ধীরে বাজেট বাড়িয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কফি চাখা শুরু হলো। এখনো সেই পরীক্ষণ চলছে। তাই এখনো মনঃস্থির করতে পারিনি কোন ব্র্যান্ড সেরা।

স্টোভ টপ এস্প্রেসো কফি মেকার

টেক্সাসে এসে নতুন আরেক ব্র্যান্ডের গ্রাউন্ড কফি কিনলাম। কিন্তু বাসায় এসে কৌটা খুলে দেখি সেটা এস্প্রেসো বানানোর গ্রাউন্ড কফি। আমরা কৌটার গায়ে ‘এস্প্রেসো গ্রাউন্ড কফি’ খেয়াল করিনি। শুধু গ্রাউন্ড কফি দেখে কিনে ফেলেছি। এখন উপায়? কৌটার মুখ থেকে প্লাস্টিকের আবরণ সরিয়ে ফেলেছি বলে ফেরত দেওয়া যাবে না। তার মানে একটাই সমাধান – এস্প্রেসো বানানোর যন্ত্র কিনে ফেলা। ইতালিয়ান অফিসে কাজ করার সময় দেখতাম চুলার উপর দারুণ সুন্দর একখানা যন্তর বসিয়ে অফিসের বাবুর্চি শহীদ ভাই ইতালিয়ান সহকর্মীদের জন্য এস্প্রেসো কফি বানাচ্ছেন। প্রেশার কুকারের মত হিস হিস শব্দ করে যন্ত্রটা এস্প্রেসো বানাচ্ছে। সেটাই কিনে ফেললাম। এস্প্রেসো খাওয়ার পেয়ালাও আলাদা। বড় মগ বা পেয়ালায় এই কফি খায় না। প্রচণ্ড চাপ দিয়ে তৈরি করা হয় বলে অল্প পরিমাণ কফিতেই ক্যাফেইনের মারাত্মক ঘনত্ব থাকে। তাই সেটা খাওয়া হয় ছোটো ছোটো কিউট ডিব্বায়। এভাবে এস্প্রেসো খাওয়াকে বলে ‘এস্প্রেসো শট’। টেকিলা শটের মত। সেই ডিব্বার একটা সেটও কেনা হলো। মহা সমারোহ করে এস্প্রেসো চালু হলো বাসায়। বড়লোকের কফি হয়ে গেলো গরীব গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর দৈনিক পানীয়। জীবন কী অদ্ভুত! তবে প্রিন্সের নাকি এস্প্রেসো খেলে ঘুমে চোখ বুজে আসে। এতো তিতা আর ঘনত্বওয়ালা একটা পানীয় খেয়ে কীভাবে মানুষের ঘুম পায়, কে জানে! তাই সে আগের মত গ্রাউন্ড কফিতে বহাল আছে, আমি এস্প্রেসোয়।

কফি নিয়ে আগডুম বাগডুমের মধ্যে ঠিক হলো আমরা গ্রীষ্মের ছুটিতে রকি পর্বতমালা দেখতে যাবো। টেক্সাসের কলেজ স্টেশন থেকে কলোরাডোর রকি পর্বত পর্যন্ত ষোল ঘণ্টার ড্রাইভ। তাও একটানা চালালে। হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ির জন্য যদি একটু নামি বা টাট্টিখানার জন্য থামি, তাহলে যাত্রা আঠারো-উনিশ ঘণ্টা পর্যন্ত গড়াতে পারে। এতো লম্বা সময় ধরে প্যাসেঞ্জারের আসনে বসে থাকা খুব কষ্টের। কিন্তু আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় এটাই করতে হয়। তিন বছর ধরে কম দূরপাল্লার ভ্রমণ করিনি। প্রতিবারই প্রিন্স চালকের আসনে, আমি যাত্রীর। প্রথম প্রথম কষ্ট লাগেনি। কিন্তু এখন বিরক্ত লাগা শুরু করেছে। কাঁহাতক আর বই পড়ে, অলসভাবে বাইরে তাকিয়ে, মোবাইল টিপে কিংবা ঘুমিয়ে কাটানো যায়? তাই ঠিক করেছি কলোরাডো যাওয়ার আগেই ড্রাইভিং লাইসেন্স বাগিয়ে নেবো। এই নিয়ে তিন অঙ্গরাজ্যে আমাদের থাকা হয়েছে। প্রতিটা অঙ্গরাজ্যে গিয়েই লারনার্স পারমিট নিয়েছি। এর অর্থ গাড়ি শেখার অনুমতি। প্রতিবারই এক, দুই সপ্তাহ শিখে ফেলে রাখি, লাইসেন্স আর নেওয়া হয় না। গাড়ির অ, আ, ক, খ আমার জানা। শুধু হাত পাকানোটা হয়ে উঠছে না। তবে এবার আমি দৃঢ় সংকল্প নিয়ে নেমেছি। ডেড সিরিয়াস যাকে বলে। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়েই ছাড়বো আগামী একমাসের মধ্যে। সেজন্য গত রাত থেকে অনুশীলন শুরু করেছি। আমাদের বাসার চারদিকে কয়েক চক্কর ঘুরে মূল রাস্তায় উঠেছি। পঁয়ত্রিশের রাস্তায় পঁচিশে টান দিয়ে চালিয়েছি, কিন্তু চালিয়েছি তো! চালাতে গিয়ে বুঝেছি আত্মবিশ্বাসটাই আসল। যখনই আত্মবিশ্বাস টলে যায়, তখনই রাস্তার নিয়ম কানুন ভুলে যাই, ব্রেকের বদলে এক্সেলারেটরে চাপ দিয়ে দিই। দেখা যাক, লক্ষ্য অর্জন করতে পারি কিনা। এই পোস্ট লেখার অন্যতম কারণ হল নিজেকে চেকের মধ্যে রাখা। একটা চাপ তৈরি হবে নিজের মধ্যে।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
100 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post পিএইচডি দিনলিপি – ১০
Next post পিএইচডি দিনলিপি – ১১