Read Time8 Minute, 12 Second
উপন্যাস পর্যালোচনাঃ নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (Nivedita Research Laboratory)
ধরনঃ মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন, অনুপ্রেরণামূলক
ঔপন্যাসিকঃ শংকর
প্রথম প্রকাশঃ ১৯৬৬, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
কয়েকমাস যাবত কাঠখোট্টা দার্শনিক বই পড়তে পড়তে রসে ভরা উপন্যাসের স্বাদ ভুলতে বসেছিলাম। তবে দর্শন জাতীয় বই শুরু করাটা কষ্টসাধ্য হলেও কাহিনির ভিতরে একবার ঢুকে গেলে দারুণ মজা! এতকিছু নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ ঘটে যে, সময় পার হলেও টেরটি পাওয়া যায় না।
যাক, আসি “নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি”তে। এক লাইনে এই বইটি হল, একজন মানুষের স্বপ্ন পূরণের গল্প। তবে এক লাইন দিয়ে যদি ১৭৪ পৃষ্ঠার উপন্যাসটিকে বিচার করতে চান, ভাবেন “ধুর! একই থিমের উপর আর কতো গপ্পো পড়বো?”, তাহলে বিরাট ভুল করবেন। কারণ শংকর তার অসাধারণ লেখনী দিয়ে এতো ঝরঝরে ভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে বর্ণনা করেছেন যে, পড়তে বসলে খালি পিছলিয়েই যাবেন। কোনো কঠিন শব্দ নেই, নেই কাঠখোট্টা বর্ণনা। পুরো উপন্যাসটি রচিত হয়েছে একশো ভাগ বাস্তব জীবন নিয়ে। কিছু পড়লে মনে হবে না, ধুর! এমনটা বাস্তবে হয় নাকি? বরং মনে মনে স্বীকার করবেন, আসলেই তো! বাস্তবে তো এমনটাই ঘটে।
আচ্ছা এবার উপন্যাসের কাহিনি নিয়ে কিছু বলি। জীমূতবাহন সেন একজন বাঙালি বিজ্ঞানী। রাসায়নিক কীটনাশক নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা শুরু করলেও কালক্রমে তিনি উৎসাহী হয়ে উঠেন প্রাকৃতিক কীটনাশকের প্রতি। মানে এক প্রজাতির কীট দিয়ে আরেক প্রজাতিকে ধ্বংস করা। আর এই নেশায় মেতে উঠে জীমূতবাহন ভুলে গেলেন দিগ্বিদিক। টাকা সরবরাহ করা ছাড়াও সংসারের প্রতি যে তার অন্যান্য দায়িত্ব আছে, সেটা হয়ে গেলেন বিস্মৃত। কিন্তু মানুষের খিদে কি শুধু টাকা দিয়ে মেটে? পত্নী ঈশিতা চান জীমূতবাহনের সাথে স্বাভাবিক একটা সংসার পাততে। তিনি চান, আর দশটা মানুষের মতোই ডঃ সেন হবেন স্নেহময় পিতা, দায়িত্বশীল হাজব্যান্ড। তিনি সময় কাটাবেন সন্তান আর বৌয়ের সাথে, তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি খেয়াল রাখবেন, বড় চাকরি করে লাখ লাখ টাকা কামাই করবেন, বাড়ি গাড়ি করবেন। কিন্তু জীমূতবাহনের সেদিকে আকর্ষণ নেই। তিনি ব্যস্ত তার স্বপ্নপূরণ নিয়ে। ঠাণ্ডা মাথায় তাকে চালিয়ে যেতে হবে গবেষণা, বের করতে হবে প্রাকৃতিক কীটনাশক! এই গবেষণা কবে শেষ হবে, কবে তিনি পাবেন কাঙ্ক্ষিত ফল, সেটা মোটেও নিশ্চিত কিছু নয়। তাই ঈশিতাও মেনে নিতে পারেন না অনিশ্চিত স্বপ্নের পেছনে জীমূতের ছোটাছুটি।
কাকেই বা দোষ দেবেন আপনি? যদি আপনার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নের মূল্য বুঝার মতো মানসিকতা বা বুদ্ধি আপনার সঙ্গীর না থাকে, তাহলে আপনি যতই চান, তাকে বুঝাতে পারবেন না। আবার বিপরীতভাবেও চিন্তা করে দেখুন। তার চাওয়া পাওয়ার বিষয়টিও আপনি বুঝতে পারছেন না। বুঝতে পারছেন না, কেন ও আপনাকে মেনে নিতে পারছে না। একই চিন্তা কিন্তু সেও করছে! এক্ষেত্রে দুজনেই পুড়তে থাকবেন কষ্টের আগুনে!
সন্তান কিংবা পত্নীর সাথে ব্যক্তিত্বের সংঘাতে পড়ে জীমূতবাহন যেন নিজের সংসারেই অচ্ছুৎ হয়ে গেলেন। তবু সাংসারিক ভাবনাকে প্রশ্রয় দিতে তিনি রাজি নন। তার মাথায় খালি ঘুরে, তার প্রতিষ্ঠিত “নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি”র হাল ধরার জন্য প্রয়োজন তরুণ এক বিজ্ঞানীকে। কিন্তু কে হবে সেই নিঃস্বার্থ মানুষ, যে লাখ টাকার চাকরিকে তুড়ি মেরে পড়ে থাকবে অজ পাড়াগাঁয়ের গবেষণাগারে? কে হবে সেই তরুণ প্রাণ, যে মানুষের বৃহৎ উপকারে আসার জন্য ছেড়ে দিতে পারবে পার্থিব লোভ লালসা? নিজেকে নিবেদন করতে পারবে পতঙ্গের গবেষণায়?
হ্যাঁ, অবশেষে যেন এমন কাউকে পাওয়ার একটা আভাস এলো। কিন্তু বিধি বাম! এখানেও ঈশিতা!
দিলাম কাহিনির কিছু ইঙ্গিত। তবে এগুলোকে উড়ো কথা হিসেবেই ধরে নিন। মূল উপন্যাসে যেভাবে বৈজ্ঞানিক মনের সাথে সাধারণ মানুষের মনের তুলনা, সংঘাত দেখানো হয়েছে, সেটা স্রেফ অসাধারণ। বইটা পড়তে গিয়ে খান একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা সালমান খানের একটা উক্তি আমার বারবার মনে হয়েছে। “Whom you choose as a life partner is a far more important decision than what career you choose to pursue.” একজন মানুষ যে কতভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে নিজের স্বপ্ন পূরণ করার পথে, কিংবা যোগ্য সঙ্গী না পেলে যে কীভাবে মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথ কাঁটাময় হয়ে উঠে, তার পারফেক্ট চিত্রায়ন এই উপন্যাসটি। পড়ুন আর অনুভব করুন, কেন যোগ্য জীবন সঙ্গী নির্বাচন করা এতোটা গুরুত্বপূর্ণ!
পরিশেষে বলতে চাই, বইটা পড়লে খালি মনের সাথে মনের দ্বন্দ্ব সম্পর্কেই ওয়াকিফহাল হবেন না, বরং জানতে পারবেন পোকামাকড়ের ঘরবসতি সম্পর্কে, অনেক জ্ঞান হবে বিভিন্ন ধরনের পোকা সম্পর্কে, তাদের বৈচিত্র্যময় জীবন সম্পর্কে। কে জানে, যারা পোকা পছন্দ করেন না, তারাও প্রেমে পড়বেন প্রকৃতির অদ্ভুত এই সৃষ্টির! জানতে পারবেন, জীমূতবাহন আদৌ পেরেছিলেন কিনা নিজের স্বপ্নকে বাঁচাতে।
জানি, বইয়ের তুলনায় আমার এই পর্যালোচনাটা একেবারেই কিছু হয়নি। কিন্তু তবু লিখতে ইচ্ছে করলো। আজ থেকে ৪৯ বছর আগেও কীভাবে এতো যুগোপযোগী উপন্যাস লেখা গিয়েছিলো, সেটা বিস্ময়কর। একেই বোধহয় বলে কালোত্তীর্ণ সাহিত্য, যে সাহিত্য একটা নির্দিষ্ট সময়সীমাকে উপস্থাপন করে না, বরং সব যুগেই যার কাহিনিকে রিলেট করা যায়।
এতো সুন্দর একটা বই শেষ করে সেটা সম্পর্কে কাউকে না জানালে অনুতাপ হতো।
নিন, মজার এই ছড়াটা পড়ে লেখাটা শেষ করুন।
A centipede was happy – quite!
Until a toad in fun
Said, “Pray, which leg moves after which?”
This raised her doubts to such a pitch,
She fell exhausted in the ditch
Not knowing how to run.
