গত পর্বের মত এই পর্বেও কিছু ভৌতিক, আধা ভৌতিক আর “ভৌতিক নয় কিন্তু ভয়ের” মুভির রিভিউ দেয়ার চেষ্টা করব। উল্লেখিত বেশীরভাগ মুভিই হলিউড বহির্ভূত। কারণ, ভয়ের মুভির জন্য এখনকার জমানায় নন-হলিউডিই আমার পছন্দ। আমি চেষ্টা করেছি, খাঁটি ভূতের মুভি থেকে বেড়িয়ে অন্যরকম কিছু মুভির রিভিউ দিতে। আশা করি, ভালো লাগবে হরর প্রেমীদের।
বেশি ভালো লেগেছে
১) TESIS (1996/7.4): এটা একটা স্প্যানিশ হরর+থ্রিলার। এখানে দেখা যায়, মুভি নিয়ে অধ্যয়নরত এক ছাত্রী তার থিসিসের জন্য এমন একটা অ“সাধারণ” বিষয়কে বেছে নেয় যার সম্বন্ধে তথ্য যোগাড় করা সের্ফ মুশকিল হি নেহি, না মুমকিন হ্যায়! বিষয়টি হল – সেলুলয়েডের ফিতায় নৃশংসতা। কিন্তু মেয়েটি এই আনকমন বিষয় নিয়েই এগিয়ে যেতে চায়। আর যেতে গিয়েই জড়িয়ে পড়ে এমন এক নৃশংস বাস্তবতার সাথে, যেখানে ওর জীবন আরেকজনের খেলার পুতুল…
হরর থ্রিলার হিসেবে একশতে একশ পাওয়ার যোগ্য মুভি!
২) NOROI: THE CURSE (2005/7.1): এটা হল জাপানিজ হরর। পুরো মুভিটি একটি ডকুমেন্টারি হিসেবে দেখানো হয়েছে। কোবায়াশি নামক একজন paranormal expert জাপানের বিভিন্ন জায়গায় অস্বাভাবিক ঘটনা খুঁজে বেড়ান। কিন্তু কোন বাস্তবসম্মত ভৌতিক ঘটনা খুঁজে পান না। একসময় খুঁজতে খুঁজতে তিনি পেয়ে যান জীবনের সবচাইতে কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা যা তাঁর পেশাগত জীবনকে আলোড়িত তো করেই… পারিবারিক জীবনকেও দাঁড় করিয়ে দেয় খাদের কিনারে।
৩) THE HIDDEN FACE (2011/7.1): এটা একটা কলোম্বিয়ান সাইকোলজিক্যাল হরর, বলিউডে যাকে রিমেক করে মার্ডার-৩ বানানো হয়েছে। মুভিটির সারমর্ম হল, প্রতারণা-অনুতাপ-প্রতিশোধ আর ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
আদ্রিয়ান বুঝতে পারে না, প্রেমিকা বেলেন কেন তাকে ছেড়ে চলে গেল। বুঝতে পারে না, কি ছিল ওর অপরাধ। তাই পোড়ামনকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য এই অর্কেস্ট্রাবাদক নিয়মিত বারে যেতে শুরু করল। বারের ওয়েট্রেস ফাবিয়ানার সাথে ধীরে ধীরে ওর সখ্যতা গড়ে উঠল। একদিন ফাবিয়ানা চলে এল বড়লোক প্রেমিকের বিশাল বাড়িতে। আর আসার পরপরই বেচারা মুখোমুখি হতে থাকল ব্যাখ্যার অতীত সব কাণ্ডের। এক পর্যায়ে ফাবিয়ানা সন্দেহ করল, ভৌতিক এই কাজ কারবার কি আসলেই ভূতের? নাকি ওকে ভয় দেখিয়ে মজা পাচ্ছে অন্য কেউ?? নাকি কেউ কিছু চাইছে???
৪) [REC] (2007/7.5): স্প্যানিশ হরর মুভি। গত পর্বে উল্লেখিত REC 2-এর প্রিকুয়েল।
টিভি রিপোর্টার আঙ্খেলা তার ক্যামেরাম্যানসহ বার্সেলোনার এক ফায়ার-ব্রিগেড অফিসে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দমকল বাহিনীর নৈশজীবন নিয়ে ডকুমেন্টারি বানাবে আর কি! ভাগ্যের পরিক্রমায় দুজনে যুক্ত হয়ে পড়ে ওই বাহিনীর এক উদ্ধারকার্যের সাথে। আর এই উদ্ধার অভিযান যে ওদের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় এক বিষয় হয়ে দাঁড়াবে, কেউ কি ভেবেছিলো যাওয়ার আগে? উদ্ধার কর্মীদেরই যদি উদ্ধার করার প্রয়োজন পড়ে, তার উপর যদি প্রয়োজনটাকে উচ্চমহল থেকে বাতিল করে দেয়া হয়, কাহিনীটা কি একটু ঘোলাটে হয়ে যায় না??
৫) MAMA (2013/6.3): স্প্যানিশ-কানাডিয়ান যৌথ হরর প্রোজেক্ট। ইতোমধ্যেই এটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়ে গেছে। তবুও আমি সংক্ষেপে কিছু লিখছি। এক অতৃপ্ত আত্মা দুটি বাচ্চা মেয়ের মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একইসাথে একজন মানবীও মেয়ে দুটোর প্রতি অপত্য স্নেহ অনুভব করে। এই দুই ভালোবাসার মধ্যেকার অনুভূতি, প্রতিযোগিতা সর্বোপরি মেয়েদুটোর মনে কার প্রতি বেশি আকাঙ্ক্ষা… এই রহস্য নিয়েই ঘুরপাক খেয়েছে অন্যরকম এই হররটি। নামকরণ পুরোপুরি সার্থক।
ভয়ের সাথে ভালোবাসা মিশানো একটা “ককটেল” অনুভূতি পাওয়ার জন্য দেখা যেতে পারে “মামা”।
৬) MARTYRS (2008/6.9): ফ্রেঞ্চ হরর মুভি। আবর্তিত হয়েছে লুসি আর আনা নামের দুই বন্ধুকে ঘিরে। সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, ছোট্ট লুসি পালিয়ে যাচ্ছে কোন এক পুরানো বিল্ডিঙের ভেতর থেকে। বিল্ডিঙটা কি আর কেনই বা লুসি পালাচ্ছে, এসব পরিষ্কার হয় মুভির শেষাংশে। কিন্তু এরই মধ্যে জল ঘোলা হয় প্রচুর। টানটান উত্তেজনায় লোম দাঁড়িয়ে যায় সারাটা সময়। নিষিদ্ধ সংগঠনের উদ্দেশ্য জানার পর আপনিও হয়ত একটা মীমাংসায় পৌঁছাতে চাইবেন। তবে সমাপ্তি দেখে কিছুটা হতাশ হয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে এই ধরণের সমাপ্তি আমি পছন্দ করি না। পরিচালক যা বোঝাতে চেয়েছেন, আদৌ তা বুঝলাম কি না, নিশ্চিত নই। তবে বাকি ৯৩ মিনিট আমার অসাধারণ কেটেছে মুভির বদৌলতে।
ভালো লেগেছে
১) THE SKELETON KEY (2005/6.4): এই চাবি দিয়ে খোলা যায় চিলেকোঠার একটা ঘর। কিন্তু ওই ঘরের ভিতরে আরেকটা যে ঘর আছে, ওইখানে সবার প্রবেশ নিষেধ। নার্স ক্যারোলিন ঠিক এই কাজটাই করে বসল। কিন্তু কৌতূহলের পরিণতি ক্ষেত্রবিশেষে মানুষের কল্পনারও অতীত হতে পারে। আর সেইভাবেই ক্যারোলিনকে তার কৌতূহলের দায় মেটাতে হল নিজের জীবনটা আরেকজনকে দিয়ে… কথা উল্টা-পাল্টা লাগছে? কি করব বলেন? মুভিটা দেখার পর ব্রেনটাই upside down হয়ে গেছে।
২) SINISTER (2012/6.7): আরেকটা চরম মুভি। প্লাস পয়েন্টঃ ইথান হক।
ইথান একজন true crime writer যে তার পরবর্তী উপন্যাস লেখার জন্য বউ-বাচ্চাসহ একদম ক্রাইম সংঘটিত হওয়া বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। যদিও সে কাউকেই সত্যটা বলে না, তবুও নানা কারণে বাড়িটা নিয়ে বউয়ের মনে সন্দেহ হয়। ওই বাড়িতে পাওয়া কিছু ভিডিও ক্যাসেট ইথানকে অবসেসড করে দেয়। এরপর ওর বাচ্চার সাথে ঘটা দুর্ঘটনা কিংবা বাড়িটা ছাড়ার জন্য বউয়ের অনুরোধ, কিছুই ইথানকে টলাতে পারে না। একদিন… ইথান ঠিকই বাড়ি ছেড়ে দেয় কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে… বাড়ি ছাড়া মানেই এখন মৃত্যু!
৩) ALONE (2007/6.4): এটা থাই হরর মুভি। দুই conjoined বোনের কাহিনী নিয়ে নির্মিত দারুণ একখান হরর।
প্লয় আর পিম জমজ বোন। তাদের পেট একইসাথে জোড়া লাগানো। একবার অসুস্থ হয়ে হসপিটালে অবস্থানকালে দুই বোনের পরিচয় ঘটে উই নামক এক ছেলের সাথে। দুই বোনই উইয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু উই আগ্রাসী মনোভাবের প্লয়কে নয় বরং পছন্দ করে নম্র-শান্ত পিমকে। এটা প্লয়কে ঈর্ষাতুর করে তোলে। প্লয়ের ঈর্ষার কারণে পিম দুজনের দেহ আলাদা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু অপারেশনের পর দুর্ভাগ্যবশত একজন বোন মারা যায়… বেশ কয়েক বছর পর উইয়ের সাথে পিমের সুখের সংসারে দুঃখের আগুন নিয়ে উদয় হয় অস্বাভাবিক একটা কিছু। পিমের মাও যেন অশরীরী অস্তিত্ব অনুভব করে ভীত থাকেন সবসময়। কিন্তু কি সেটা? কেনই বা হঠাৎ করে এর আবির্ভাব?
৪) RED LIGHTS (2012/6.1): রবার্ট ডি নিরো, টবি জোন্স আর সিলিয়ান মারফির মত তারকা নিয়ে তৈরি এক স্প্যানিশ-আমেরিকান হরর-থ্রিলার।
মানুষ বিশ্বাস করে রবার্ট অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অধিকারী। রোগ ভালো করে দেওয়ার ক্ষমতাও তার আছে। কিন্তু সিলিয়ান মারফি যার অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কাজ করে, সেই paranormal investigator মহিলা এটাকে বুজরুকি মনে করে। ফলে সিলিয়ানও উঠে পড়ে লাগে রবার্টকে ভণ্ড প্রমাণ করার জন্য। কিন্তু রবার্টের আসল চেহারা উন্মুক্ত করতে গিয়ে একি?? সিলিয়ানের নিজের অস্তিত্ব নিয়েই টানাহেঁচড়া শুরু হয়ে যায়…
৫) MIRRORS 1 (2008/6.0): “24” টিভি সিরিজের নায়ক Kiefer Sutherland অভিনীত এক চরম হরর+থ্রিলার! দেখতে বসলে ক্ষণে ক্ষণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, গ্যারান্টিড।
বরখাস্ত গোয়েন্দা চাকরি নেয় মে ফ্লাওয়ার নামক এক বিশাল স্টোরের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে। স্টোরটি একটা ভয়ঙ্কর অগ্নিকান্ডে ছারখার হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অন্দরের আয়নাগুলো অক্ষত রয়ে যায়। কেন? কেনই বা চাকরি নেয়া গার্ডগুলো কিছুদিন পর পাগলের মত হয়ে যায়? আত্মঘাতী হয়? আয়নাগুলোর অস্বাভাবিক আচরণের কারণই বা কি? উত্তর লুকিয়ে আছে মুভির ভেতর!
মোটামুটি লেগেছে
১) CHERNOBYL DIARIES (2012/5.0): তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণের কারণে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল শহরটা কুখ্যাত হয়ে রয়েছে। ২৭ বছর পরও এর বিভিন্ন স্থানে মাত্রাতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তা বর্তমান। আর এই ঐতিহাসিক জায়গাটা দেখার জন্যে সাহসী কিছু তরুণ-তরুণী “প্রবেশ নিষেধ” সাইনবোর্ড অমান্য করে ভয়ঙ্কর নির্জন এলাকাটায় ঢুকে পড়ে। আপনার-আমার মত ওরাও জানত না, পরিত্যক্ত এই এলাকায় ঢুকলে অন্ধকার হওয়ার আগেই বের হতে হয়… এখানে ওরা ছাড়াও আর কেউ থাকতে পারে… ঠিক “কেউ” নয়, কিছু…
শেষ দৃশ্যে আমি শকড্!
২) A NIGHTMARE ON ELM STREET (2010/5.1): দুঃস্বপ্ন আর বাস্তবতা যখন আলাদা করতে পারবেন না, মানসিক অবস্থাটা তখন কেমন দাঁড়াবে আপনার? ঘুমাতেও ভয় পাবেন। কারণ ঘুমালেই দুঃস্বপ্ন দেখার সম্ভাবনা আর দুঃস্বপ্নটা আদৌ স্বপ্নে দেখছেন নাকি বাস্তবে ঘটছে, আপনি নিশ্চিত নন! কি? লেজে-গোবরে লাগছে কাহিনী? এমনই এক জটিল কাহিনী পরিচালক ফেঁদে বসেছেন এই মুভিতে। মুভিটা ১৯৮৪ সালের মুভির রিমেক। তারকাদের অভিনয় ততটা ভালো না হলেও সময় কাটানোর জন্য উত্তম মুভি!
৩) ONE MISSED CALL (2008/3.8): মুভিটা খুব কম রেটিং পেলেও আমার ভালো লেগেছে। একই নামের জাপানিজ মুভির রিমেক এটি।
হঠাৎ করেই শুরু হয় নিজের মোবাইলে নিজের নাম্বার থেকে কল আসা। অসম্ভব এক কাণ্ড! কিন্তু এই কাণ্ডই বেথের চার বন্ধুর মরণ ডেকে আনল। ভয়ংকরভাবে আতংকিত বেথ পুলিশের কাছে ছুটে যায়। কিন্তু তারা তাকে পাত্তা দেয় না। এমন সময় গোয়েন্দা জ্যাক বেথকে বিশ্বাস করে বসে। দুজনে মিলে অস্বাভাবিক হত্যাগুলোর রহস্য সমাধানে নামে। কিন্তু বেথ নিজেও যে এর শিকার…! হাতে আছে খুব অল্প সময়… নিজেকে, নিজের প্রিয়জনকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু কোন পথে এগুলে সমাধান দ্রুত হবে? কিভাবেই বা ওরা করবে এই অবাস্তবতার সমাধান?