1 0
Read Time12 Minute, 5 Second

জ্যেষ্ঠপুত্র (২০১৯)

চার, পাঁচমাস আগে অ্যামাজন প্রাইম ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম বাংলা মুভি দেখব বলে। নেটফ্লিক্সের চেয়ে প্রাইমে বাংলা মুভির বৈচিত্র্য বেশি বলে আমার ধারণা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ নামের একটা সিনেমা। মূল দুটো চরিত্রে আছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় আর ঋত্বিক চক্রবর্তী। প্রসেনজিৎ ওরফে বুম্বাদাকে ছোটবেলায় চানাচুর মার্কা মুভিতে দেখে আলতু ফালতু অভিনেতা মনে হত। কিন্তু বাইশে শ্রাবণ দেখার পর আরও অনেকের মত আমিও বুম্বাদার পাখা বনে গেলাম। আবিষ্কার করলাম তার সত্যিকার প্রতিভাকে। কী দুর্দান্ত একজন অভিনেতা! এরপর অটোগ্রাফ দেখে দ্বিতীয়বারের মত দাদার প্রেমে পড়লাম। সে প্রেম বেড়ে গেল জাতিস্মর দেখে। তবে সত্যি বলতে, কলকাতার মুভি খুব বেশি দেখা হয় না বলে প্রসেনজিতের বাইরে রুদ্রনীল, পরমব্রত, শ্বাশত, আর আবীর ছাড়া কাউকে চিনতাম না। কিন্তু ‘ভিঞ্চি দা’ দেখার পর মজে গেলাম ঋত্বিকে। বাউ রে! সে কী অভিনয়। সে সাথে অনির্বাণ নামের এক ছেলেকেও চিনলাম। তো, জ্যোষ্ঠপুত্রে বুম্বাদা আর ঋত্বিক আছেন দেখে দেরি না করে বসে পড়লাম। আরেকটা কারণও ছিল আগ্রহের পিছনে। সেটা হল, মুভির পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি।  সেই ২০১৩ সালে ‘শূন্য এ বুকে’ দেখার পর থেকে উনি আমার অন্যতম প্রিয় পরিচালক। আমি ধরেই রাখি উনার মুভিগুলো অন্যরকম হবে। ভাবনার উদ্রেক করবে, কিন্তু ধীরগতির লাগবে না।

জ্যেষ্ঠপুত্র দেখার পর মনে হল, এ ছবি নিয়ে যতটা হইচই হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। এত সুন্দর একটা বিষয়, এত সুন্দর বাস্তবায়ন, এত সুন্দর পরিচালনা আর অভিনয়! হ্যাঁ, পুরো মুভি শোকাচ্ছন্ন পরিবেশে চিত্রায়িত হয়েছে; নেই কোনো নাচগান; নেই মারপিট। কিন্তু মনের ক্ষুধা বলে যে অনুভূতি আছে, সেটাকে সম্পূর্ণ তৃপ্ত করার রসনা ছিল। তারপরই মনে হল, গ্ল্যামার না থাকলে আমজনতার কাছে মুভি হিট হয় না। সে হিসেবে হইচই না হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে, হিট ফ্লপ দিয়ে আমার কাজ কী? আমি কৌশিক গাঙ্গুলিকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে রিভিউ লিখতে বসলাম। কিন্তু বেশি কিছু বলব না। মুভির প্রথম পাঁচ মিনিটে যা দেখানো হয়েছে, তারচেয়ে বেশি বললে সেটা স্পয়লার হয়ে যায়। তাই এটুকু ইঙ্গিত দিই, ইন্দ্রজিৎ আর পার্থ দুই ভাই। ইন্দ্রজিৎ বড় এবং একজন চলচ্চিত্রাভিনেতা। পার্থ ছোট, গ্রামে থাকে বাবার সাথে। একদিন বাবা মারা যান। এরপরই শুরু হয় কাহিনী। পারিবারিক কাহিনী। বড় ভাই এবং ছোট ভাইয়ের কাহিনী।

সবচেয়ে ভাল লেগেছে দুই ভাইয়ের মধ্যকার রসায়ন। আদি এবং অকৃত্রিম বাঙালি পরিবারগুলোতে ভাইবোনের সম্পর্ক কেমন হয়, পরিবারের প্রতি কার দায়িত্ব কতটুকু, পরিবারের ভেতরের গুপ্ত কাহিনী, ঈর্ষা, কষ্ট, ভালবাসা… সবকিছুর মিশেল এই চলচ্চিত্র। দেখতে দেখতে বাস্তব জীবনের সাথে মেলাতে পারছিলাম খুব। এখানেই কৌশিকের কেরামতি। অবাস্তব, গাঁজাখুরি গল্প নিয়ে কাজ না করে কাজ করেছেন নিত্যনৈমিত্তিক কাহিনী নিয়ে। মনে হয় যেন আমাদের গল্পই বলছেন। যারা ফ্যামিলি ড্রামা পছন্দ করেন, তাদের খুবই ভাল লাগবে। আর যারা দ্রুতগতির মুভি চান, তাদের বেলায় সন্দেহ থেকে যায়। শেষ করার আগে একটা মজার তথ্য দিই। মুভির কাহিনীটা প্রথমে মাথায় আসে প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের। তারই ‘অন্য নায়ক’ নামক খসড়া থেকে কৌশিক তৈরি করেন এই মুভি।

 

রামপ্রসাদ কি তেরভি (২০১৯)

মাসখানেক আগে নেটফ্লিক্সে যোগ হয়েছিল Ramprasad Ki Tehrvi নামের এক হিন্দি মুভি। সেখানে কংকনা সেন শর্মা, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, আর নাসিরুদ্দিন শাহ্‌ আছেন বলে খুব আগ্রহ হয়েছিল দেখার। তেরভি শব্দের অর্থ জানা ছিল না বলে বুঝতে পারিনি মুভিটা কী নিয়ে। পারিবারিক ছবি হিসেবেই দেখতে বসেছিলাম। কিন্তু একটু পরই বুঝতে পারলাম কাহিনী রামপ্রসাদের মৃত্যুকে ঘিরে। রামপ্রসাদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসিরুদ্দিন। তো, উনাকে সিনেমার শুরুতেই মরে যেতে দেখে ভাবছিলাম, এত বড় একজন আকর্ষণ যদি বাদ পড়ে যায়, বাকি সিনেমা কীভাবে চলবে? পরিচালক সীমা পাওয়া নিশ্চয় হাসছিলেন আমার মত নাদানদের চিন্তা দেখে! কারণ বাকি মুভি উনি যেভাবে টেনে নিয়ে গেছেন, বুঝা সম্ভব না এটা উনার প্রথম পরিচালনা। কী দারুণ চিত্রায়ন! গল্প খানিকটা জ্যেষ্ঠপুত্র গোছের, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র মৃত্যুকে ঘিরে থিমটা মিলে গেছে বলে। নাহলে চিরাচরিত ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী হিসেবে দুটো সিনেমা দুই ধরনের গল্প বলেছে।

রামপ্রসাদ কি তেরভিতে প্রচুর চরিত্র। তবে অবাক হয়ে দেখলাম পরিচালক প্রতিটা চরিত্রকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। দেখেই বুঝা যায় প্রচণ্ড যত্ন নিয়ে কাজটা করা হয়েছে। কোনো চরিত্র দেখেই মনে হয়নি, এটাকে না আনলেও পারত। দিনশেষে প্রশ্ন জাগেনি, ঐ চরিত্র কোথায় গেল? বরং সবগুলো চরিত্র পূর্ণতা পেয়েছে। সুন্দর ক্লোজার পেয়েছে। একটাই আক্ষেপ আমার। পরমব্রতর বদলে আবীর বা অনির্বাণকে নিলে কী ক্ষতি হত? পরমব্রতর অভিনয় কাঁচা লাগে। এছাড়া বাকি সবাই দশে দশ। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, যত বয়স হচ্ছে, ততই আমার গ্ল্যামারাস নায়ক, নায়িকা বাদ দিয়ে বানানো সিনেমাগুলো ভাল লাগছে। ভিক্রান্ত ম্যাসে নামের যে ছেলেটা এখানে অভিনয় করেছে, তাকে প্রথম চিনেছিলাম ‘ডেথ ইন দা গুঞ্জ’ নামের মুভিতে। কী অসাধারণ অভিনয়ই না করেছিল! আবার এই মুভিতে নিজেকে ভেঙ্গেচুরে অন্যরকম একটা চরিত্র করেছে। অথচ নায়ক বলতে আমরা যা বুঝি (আমজনতার চিন্তাধারায়), সেরকম কিছুই তার মধ্যে নেই। সেলেব্রিটি বলতে ছিলেন শুধু কংকনা আর পরমব্রত। তাও তারা অন্যদের চেয়ে একবিন্দু বেশি সময় পাননি। এখানেই বুঝেছি পরিচালকের মুনশিয়ানা।

ওহ আচ্ছা, হালকা ইঙ্গিত দিই গল্পটা কী নিয়ে। গল্প হল, রামপ্রসাদ মারা গেছেন। পিছে রেখে গেছেন বিশাল পরিবার। পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো ভারতে। বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সবাই একে একে হাজির হয় গ্রামের বাড়িতে। শুরু হয় কাহিনী। বিশাল পরিবার, বিশাল গল্পের জাল। পারিবারিক ড্রামা ভাল লাগলে দেখতে পারেন। আমার দারুণ লেগেছে।

পাগলাইট (২০২১)

নেটফ্লিক্সেরই আরেকটা মুভি। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে। যখনই নেটফ্লিক্সে ঢুকি, তখনই চোখের সামনে বিজ্ঞাপন চলতে থাকে। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছে সানিয়া মালহোত্রা। মেয়েটাকে ‘বাঁধাই হো’ মুভিতে দেখে অনেক ভাল লেগেছিল। সাবলীল অভিনয়। ওর জন্যই সিনেমাটা দেখতে বসি। আর টা ডা! আমাকে একটুও হতাশ করেনি সানিয়া। ঠিক যেন পাশের বাড়িতে বউ হয়ে আসা মেয়েটা। জামাইয়ের মৃত্যুর পর ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। হ্যাঁ পাঠক, এই সিনেমারও শুরু হয় মৃত্যু দিয়ে। পরিবারের বড় ছেলে মারা গেছে। রেখে গেছে বাবা, মা ছোট ভাই, আর বউকে। বড় ছেলে মারা যাওয়া মানে ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর দিশেহারা হয়ে যাওয়া। সে বাস্তবতাই চরম সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক উমেশ বিস্ত। গল্পও উনারই। সাথে অরিজিৎ সিংয়ের সঙ্গীত পরিচালনা অন্যরকম সৌন্দর্য এনে দিয়েছে মুভিতে। আমি এতদিন পর্যন্ত গায়ক অরিজিৎকেই চিনতাম। সে যে চলচ্চিত্রের সঙ্গীতও পরিচালনা করে, সেটা জানতাম না। এ পর্যন্ত অরিজিৎ মাত্র দুটো মুভির সঙ্গীত পরিচালনা করেছে। প্রথমটায় ওর সাথে আরও একজন ছিল। কিন্তু এটায় সে একা কাজ করেছে। কী দারুণ সে কাজ! কী সুন্দর সব আবহ সঙ্গীত! মুভির থিমের সাথে খাপে খাপ আব্দুল্লার বাপ হয়ে মিলে যায় সুরগুলো।

মুভিটা বিশেষভাবে ভাল লেগেছে একজন মেয়ের প্রেক্ষাপট থেকে দেখানো হয়েছে বলে। সমাজের আরোপিত নিয়ম মেনে নিজের জীবন ধ্বংস করা (এক্ষেত্রে বিয়েশাদি করা), ভালবাসাহীন সংসার জীবন চালিয়ে যাওয়া, এগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের সাধারণ সত্য। ছেলে, মেয়ে, অন্য লিঙ্গ, সবাই এসব প্রথার শিকার। কিন্তু ক’জন পারে এসব প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে? না পারলে কেন পারে না? পারার জন্য কোন বোধটা জেগে উঠা দরকার? আস্তিক মারা যাওয়ার পর এসব চিন্তাই আমরা সন্ধ্যার চোখ দিয়ে দেখি। দেখি আর ভাবি, বাস্তবতা আসলে এমনই। তবে শেষে একটু বেশি নাটকীয় করে ফেলেছেন পরিচালক। দেখলেই বুঝবেন আমি কীসের কথা বলছি।

Happy
Happy
33 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
67 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post Ph.D.ঃ Permanent head Damage, নাকি Patiently hoping for a Degree?
Next post টেক্সাসে যাওয়ার প্রস্তুতি