
লোককাহিনী এবং পুরাণে বর্ণিত বিভিন্ন পশুর মধ্যে বোধহয় ইউনিকর্ন এবং ড্রাগনের নামই সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত! চলুন আজ কথা বলি ইউনিকর্ন নিয়ে। ছোটবেলা থেকেই এই শিংওয়ালা ঘোড়ার গল্প আমরা পড়ে এসেছি। এটার এমনই আকর্ষণ যে, বড় হয়েও কোথাও ইউনিকর্নের নাম শুনলে একটু ঢুঁ মেরে বসি উৎসটায়। পাশ্চাত্য সাহিত্যই ইউনিকর্নকে নিয়ে লম্ফঝম্ফ করে বেশী। সেখান থেকে আমাদের ধারণা হয়েছে, এরা আসলে সাদা রঙের ঘোড়া। স্বাভাবিক ঘোড়া থেকে এদের একটাই পার্থক্য – কপাল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা চোখা শিং। এই শিং কোন ছবিতে মসৃণ, আবার কোন ছবিতে প্যাঁচানো।

এই শিঙের আছে জাদুকরী ক্ষমতা। এটি বিভিন্ন রোগ ভালো করতে এবং বিষ শনাক্ত করতে পারে। এই তো, ১৭৪১ সালের দিকেও ইউরোপে নারওয়াল তিমির দাঁতকে ইউনিকর্নের শিং হিসেবে বর্ণনা দিয়ে সেটার গুঁড়োকে ওষুধ হিসেবে বিক্রি করা হত। শক্তিশালী এবং হিংস্র ইউনিকর্নের একটাই দুর্বলতা। সেটা হল, কুমারী মেয়ে। এরা কুমারীকে দেখলে শান্ত হয়ে তার কোলে লুটিয়ে পড়ে আর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়। এই কৌশলকে কাজে লাগিয়ে শিকারিরা বন্দী করে ইউনিকর্নকে।

আজ আমরা জানবো এই ইউনিকর্ন তথা একশৃঙ্গের কিছু মজার আর অজানা তথ্য, যা আপনাদের নিঃসন্দেহে আমোদিত করবে।
![]()
খুব সহজে ইউনিকর্নের পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একেক অঞ্চলের লোকগাঁথায় একেকভাবে উঠে এসেছে রহস্যময় এই প্রাণীর বর্ণনা। বিখ্যাত অনেক ব্যক্তিও ইউনিকর্নকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। জেনে রাখা ভালো, প্রাচীন গ্রীসের প্রাকৃতিক ইতিহাসে বা মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁ আমলের ইউরোপে ইউনিকর্নের কথা উল্লেখ থাকলেও এটির উৎপত্তিস্থল হিসেবে ধারণা করা হয় ভারতীয় উপমহাদেশকে! ইউনিকর্ন নিয়ে সবার প্রথমে হয়ত গ্রীক ইতিহাসবিদ “তিসিয়াস” লিখেছিলেন। তাঁর “Indika (“ভারতে”)” বইটিতে ইউনিকর্নের বর্ণনা দেওয়া আছে এভাবে – বন্য গাধা, দ্রুতগামী, সাতাশ ইঞ্চি লম্বা শিং আছে (যেটার রঙ সাদা, লাল, কালো)। এরিস্টটলও দুই ধরণের “একশৃঙ্গ বিশিষ্ট প্রাণী”র কথা বলেছেন, যথা – অরিক্স (এক ধরণের এন্টিলোপ) এবং ভারতীয় গাধা।

রোমান লেখক এলিয়ান তাঁর “On the Nature of Animals ” বইয়ে বলেছেন, ভারতে এক শিংওয়ালা ঘোড়া পাওয়া যায়। এছাড়া রোমান প্রকৃতিবিদ প্লাইনি দ্য এল্ডার-ও এক শিংবিশিষ্ট ভারতীয় ষাঁড়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন (ধারণা করা হয়, তিনি গণ্ডারের কথা বলেছেন)। এছাড়া তিনি পুরুষ হরিণের মাথা, হাতির পা, পুরুষ শূকরের লেজ এবং ঘোড়ার দেহবিশিষ্ট একটি প্রাণীর কথা বলেছেন, যার কপালের মাঝখান থেকে তিন ফুট লম্বা একটি কালো রঙের শিং গজিয়েছে। মিশরীয় বণিক কসমাস (যিনি ষষ্ঠ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন) ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন। সে সময় ইথিওপিয়ার সম্রাটের রাজপ্রাসাদে তিনি ব্র্যাসের তৈরি চারটি ইউনিকর্ন মূর্তি দেখেন এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে ইউনিকর্ন সম্পর্কে যা জানেন তা হল, জীবিত অবস্থায় এই হিংস্র পশুকে ধরা অসম্ভব। এদের সকল শক্তি শিংয়ে। ইউরোপীয় লোকগাঁথায় ইউনিকর্নকে দেখা হত সাদা ঘোড়া, গাধা বা ছাগলের আদলে, যার লম্বা একটা শিং, চেরা খুর আর ছাগলের মত দাড়ি আছে। মধ্যযুগ আর রেনেসাঁ আমলের ইউরোপে ইউনিকর্নকে মনে করা হত প্রচণ্ড হিংস্র এক বন্য পশু, যা বিশুদ্ধতা আর মহিমার প্রতীক, এবং যাকে শুধুমাত্র কুমারী মেয়েরাই বন্দী করতে পারে।

তবে তেরো’শ শতাব্দীর বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো এই মধ্যযুগীয় ইউনিকর্নের বর্ণনায় পানি ঢেলে দেন। তিনি দাবী করেন যে, জাভাতে তিনি ইউনিকর্ন দেখেছেন। প্রাণীটি সম্পর্কে পোলো বলেন, “হাতি থেকে সামান্য ছোট, মহিষের মত লোমযুক্ত, হাতির মত পা-ওয়ালা, কপালের মাঝখান থেকে কালো রঙের শিং গজানো, পুরুষ শূকরের মত মাথাযুক্ত অত্যন্ত কুশ্রী একটি জন্তু। এরা নোংরা কাদায় গড়াগড়ি করে সময় কাটায়। এরা কোনোমতেই কুমারী মেয়ে দ্বারা বন্দী হওয়ার মত প্রাণী নয়। বরং আমাদের মতবাদের পুরো উল্টো বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রাণী!” তবে আশাহত হওয়ার কিছু নেই। কারণ পোলো যাকে দেখে ইউনিকর্ন মনে করেছিলেন, সেটি আদতে ইউনিকর্নই নয়। জাভা দেশীয় গণ্ডার!
তো আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? ইউনিকর্ন নিয়ে নির্দিষ্ট কোন মতবাদ নেই। বিভিন্ন জায়গায় এর দৈহিক বর্ণনা বিভিন্ন কিসিমের। এর কারণ কী? সম্ভাব্য কারণ হতে পারে – ১) প্রাণীটিকে কেউই সরাসরি দেখে নি। শুধু লোক মুখে শুনে বিশ্বাস করেছে এবং নিজের মনমত রঙচঙে বর্ণনা বানিয়ে পরবর্তী প্রজন্মে চালান করেছে; ২) যদি কেউ দেখেও থাকে, সে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বক্তব্য ছাড়া কোন প্রমাণ রেখে যেতে পারে নি। তাই প্রাণীটি আসলে দেখতে কেমন, সেটা কেউ জানে না কিন্তু বর্ণনা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে; ৩) এক শিং ভাঙা অরিক্স বা এন্টেলোপ দেখে ইউনিকর্নের জন্ম দিয়েছে মানুষ। হয়ত শিকার করতে গিয়ে বা শিকারির হাত থেকে নিজেকে রক্ষার সময় দুটো শিংয়ের মধ্যে একটি হারাতে হয়েছে ওদের কাউকে। আর সেটি দেখেই মানুষ ভেবে নিয়েছে, এক শিংওয়ালা প্রাণী! এরপর নিজেদের মত কাহিনী তৈরি করে সেটা ছড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব কিছু না। আর বক্তব্য বিকৃত হতেই বা কতক্ষণ?; ৪) Elasmotherium নামক ইউরেশীয় অঞ্চলের এক বিলুপ্ত প্রজাতির গণ্ডার থেকে ইউনিকর্নের কাহিনী এসেছে। এটি দেখতে কিছুটা ঘোড়ার মত এবং কপালে বড়সড় এক শিংয়ের অধিকারী।


দেখা যাচ্ছে, তিন এবং চার নাম্বার যুক্তিই সবচেয়ে জোরালো যুক্তি। আর আধুনিক যুগে তো ইউনিকর্নকে বানানো হয়েছে আরও রঙচঙে। এখনকার ইউনিকর্ন রঙধনুতে চড়ে চলাফেরা করে। এখন আসছি লাখ টাকার প্রশ্নেঃ

যদিও অনেকের ধারণা, ইউনিকর্নের অস্তিত্ব একসময় ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে বাস্তববাদীরা এই ধারণা মেনে নেন না। জার্মানির হার্জ পর্বতের ইউনিকর্ন নামক গুহায় প্রাগৈতিহাসিক আমলের অনেক হাড়গোড় পাওয়া গিয়েছিল। মাগদেবার্গ শহরের মেয়র অটো ভন গুয়েরিকে সেসব হাড়ের মধ্যে ইউনিকর্নের হাড় আছে বলে মনে করেছিলেন এবং ১৬৬৩ সালে কিছু হাড়কে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করেছিলেন দুই পা-ওয়ালা ইউনিকর্নের কংকাল। কিন্তু বিধি বাম! পরবর্তীতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এসব হাড় ইউনিকর্নের নয়; বরং গণ্ডার এবং ম্যামথের ফসিল হওয়া হাড়। সাথে ছিল নারওয়ালের দাঁতের ফসিল।


কোন বিলুপ্ত হওয়া প্রাণীর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় ফসিলের মাধ্যমে। ডাইনোসরের কথা আমরা এভাবেই জেনেছি। কিন্তু ইউনিকর্নের কোন ফসিল আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। ফলে এটাকে একটা মিথ হিসেবেই আমাদের গ্রহণ করতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরও কথা থাকে। যদি একেবারেই ইউনিকর্ন নামক প্রাণীটির অস্তিত্ব না থাকতো, তাহলে সিন্ধু সভ্যতার দুটো প্রধান শহর – হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোতে কেন পাওয়া গেল ইউনিকর্নের আকৃতি সম্বলিত সীল? খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সালের সীলগুলোতে সিন্ধুর ভাষাও লেখা আছে। এই সীলগুলো এখনও গবেষকদের ভাবিয়ে চলেছে।


তবে তাঁরা রহস্য উদ্ঘাটন করতে চেয়েছেন এভাবে – সীলে ইউনিকর্নের মত যে প্রাণীটি দেখা যাচ্ছে, সেটা ওরক (aurochs) নামের একটি বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণী বা তার থেকে উদ্ভূত প্রজাতি। এবং সীলে একশৃঙ্গ বিশিষ্ট কোন প্রাণী দেখা যাচ্ছে না। বরং ওরকের একপাশের শিং দেখা যাচ্ছে।

কে জানে, এই তথ্যগুলো শুধু দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য গবেষকরা বের করেছেন কিনা! কারণ ফসিল পাওয়ার সময় শেষ হয়ে যায় নি। আর এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ইউনিকর্ন কখনো ছিল না।
যারা সত্যজিৎ রায়ের ভক্ত, তারা আশা করি “একশৃঙ্গ অভিযান” উপন্যাসটি পড়েছেন। আর যারা পড়েন নি, তারা রায়ের অসাধারণ সৃষ্টি ‘প্রফেসর শঙ্কু’র এই অমানবিক অভিযানটি পড়ে ফেলতে পারেন। ইউনিকর্নের সাথে যোগসূত্র আছে বলেই অনুরোধটি করছি।
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং ইন্টারনেট