0 0
Read Time13 Minute, 26 Second

যারা বিটিভিতে হারকিউলিস (কিংবা “ইয়াং হারকিউলিস”) সিরিয়াল দেখেছেন, তাদের কি মনে আছে অর্ধেক ঘোড়া আর অর্ধেক মানুষরূপী জন্তুটির কথা? অবশ্য একে জন্তু বলা যায় না, কারণ ঘোড়ার গলা থেকে মাথা পর্যন্ত তো মানুষ! আর যারা হারকিউলিস জমানার নন, তারা তো নার্নি‌য়া মুভি কিংবা হ্যারি পটারে দেখেছেন একে, নাকি?

 

যা হোক, হারকিউলিসের মাধ্যমে পরিচয়ের পর সেন্টর আমার মনে ভীষণ রেখাপাত করেছিল। তাই ছোটবেলার এই ক্রেজকে নিয়ে এই পেইজে কিছু না লিখলে আফসোস থেকে যাবে।

 

পুরাণের আদি ইতিহাস থেকে জানা যায়, সেন্টররাই মানব ইতিহাসের প্রথম দিককার গুহাবাসী গোষ্ঠী; একইসাথে পর্বত আর জঙ্গলে বসবাসকারী গোষ্ঠীও বটে। এরা ছিল মূলত ষাঁড় শিকারি। এরা হিংস্র আর অসভ্য জীবন যাপন করত। প্রায়ই আশেপাশের অঞ্চল থেকে মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে আসা এবং পশুর মত সারা পর্বত, বনাঞ্চল চষে বেড়ানো ছিল তাদের অভ্যাস। অল্প মদ খেলেই সেন্টররা মাতাল হয়ে যেত এবং ভয়ঙ্কর রকমের মাতলামি করত। উচ্চ যৌনাকাঙ্ক্ষার জন্যেও তারা কুখ্যাত! বলা হয়, ওদের মধ্যে বেশীরভাগই দেবতা ডায়োনাইসিয়াসের অনুসারী ছিল। কারণ এই দেবতা মাতাল এবং হৈহুল্লোরকারী অনুসারীদেরই পছন্দ করতেন।

সেন্টররা গ্রীস দেশের ম্যাগ্নেশিয়া অঞ্চলে, থেসালির পেলিওন পর্বতে, ইলিসের ওক বৃক্ষের জঙ্গলে এবং দক্ষিণ ল্যাকোনিয়ার মালিন উপদ্বীপে নিজেদের আস্তানা গড়ে তুলেছিল। যেহেতু ওরা সাধারণ জনগণের মত স্বাভাবিক নয়, বরং বর্বর জীবন যাপন করত, তাই সভ্য সমাজ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলো।

 

সেন্টর গোষ্ঠীটি উৎপত্তি লাভ করে এক্সাইয়ন (Ixion) এবং ন্যাফেলি (Nephele)-এর মিলনের ফল হিসেবে। এই মিলন আবার যে সে ভাবে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে জিউসের কালো হাত! জিউসের এক ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়ে আসার পর জিউসের স্ত্রী এবং দেবদেবীদের রাণী হেরার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এক্সাইয়ন তার প্রেমে পড়ে যায় এবং জোর করে হেরার সাথে মিলিত হতে চায়। এতে হেরা ক্ষিপ্ত হয়ে জিউসকে এক্সাইয়নের আচরণ সম্পর্কে নালিশ জানান। জিউস শোনা কথায় বিশ্বাস না করে নিজেই ব্যাপারটা যাচাই করতে চান। এজন্য তিনি ন্যাফেলি নামের এক মেঘকে হেরার চেহারায় রুপান্তরিত করে এক্সাইয়নের পাশে শুইয়ে দেন। এক্সাইয়ন আদৌ হেরার সাথে মিলিত হতে ইচ্ছুক কিনা, এটা দেখাই জিউসের উদ্দেশ্য ছিল। আর হ্যাঁ, হেরারূপী ন্যাফেলির সাথে এক্সাইয়ন মিলিত হয়। এতে জিউস ক্ষেপে গিয়ে এক্সাইয়নকে শাস্তি দেন আর ওই মিলনের ফলে ন্যাফেলি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সেন্টরদের জন্ম দেন।

খ্রিস্টের জন্মের ৫৩০ বছর আগে অঙ্কিত সেন্টরের ছবি, সংরক্ষিত আছে জার্মানির এক জাদুঘরে

দ্বিতীয় উৎস থেকে জানা যায়, “ন্যাফেলির সাথে এক্সাইয়নের” কিংবা “অ্যাপোলোর সাথে নদীর দেবতা পিনিওসের কন্যা স্টিল্‌বের” মিলনের ফলে জন্ম নেয় সেন্টোরাস (Centaurus)। এই সেন্টোরাস আবার ম্যাগ্নেশিয়া অঞ্চলের এক মাদী ঘোড়ার সাথে মিলিত হয়। ফলে ঘোড়াটি প্রসব করে সেন্টরদের। এই উৎস অনুযায়ী, অ্যাপোলো এবং স্টিল্‌বের ঘরে কিংবা ন্যাফেলি এবং এক্সাইয়নের ঘরে ল্যাপিথি নামে সেন্টোরাসের জমজ ভাইও জন্মগ্রহণ করে। এই ল্যাপিথি হল “ল্যাপিথ” গোত্রের পূর্বপুরুষ। ফলে ল্যাপিথ আর সেন্টর – এই দুই গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক দাঁড়ায় চাচাতো ভাই বেরাদারের। কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণ বলে কথা! এই ল্যাপিথদের সাথেই একসময় প্রচণ্ড যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সেন্টররা। সে কথায় পরে আসছি। আগে বলে নিই, এমনিতেই মিথলজির সমস্যা হল, কে যে কার বাপ, কে যে কার মা, কে ভাই, কে বোন – সে বিষয়ে পেঁচগি লাগতে থাকে; তার উপর কোনো ইতিহাসই যেন ১০০% সলিড নয়। প্রায় প্রতিটা ঘটনারই একটা, দুটো বিকল্প উৎপত্তি থাকে। এতে পাঠকের মস্তিষ্ক আউলিয়ে গেলে লেখক দায়ী নহে!

 

সেন্টরের এইরূপ চেহারার উৎপত্তি কিন্তু একদিনে হয় নি। এই চেহারা মানুষের দীর্ঘদিনের কল্পনার বিবর্তিত রূপ! কথাটা বলার কারণ মূলত দুটোঃ ১) একদম প্রথমদিকে থেসালি অঞ্চলে যারা বাস করত, তারা অর্ধেক ঘোড়া অর্ধেক মানুষ ছিল না। পুরোপুরিই মানুষ ছিল। আর ঘোড়ার পিঠে চড়ে ষাঁড় শিকার করতে যাওয়াটা ছিল থেসালির জাতীয় সংস্কৃতির অংশ; ২) থেসালিয়ানরা জীবনের বেশীরভাগ সময়ই ঘোড়ার পিঠে কাটাত।

এই দুই ঘটনার উপর ভিত্তি করে এমন উপসংহারে আসা কঠিন কিছু নয় যে, থেসালির পর্বতারোহীরা যখন মাঝে মধ্যে প্রতিবেশী গোত্রের চোখে পড়ে যেত, তখন তাদের নিয়ে প্রতিবেশীরা কিছুটা সত্য এবং বেশীরভাগই অতিরঞ্জিত গপ্প বানাত। ঠিক যেমন আমরা তিলকে তাল করি। হয়ত তারা মনে করত, মানুষটি আর ঘোড়াটি একই দেহে যুক্ত একটি প্রাণী! এ থেকে হয়ত মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিলো, থেসালিয়ানরা অর্ধেক মানুষ অর্ধেক ঘোড়া!

আবার এই জনশ্রুতি বিকাশ লাভ করেছিল দুই ধারায়। মানে প্রাচীন চিত্রকলায় দুই ধরণের আকৃতিবিশিষ্ট সেন্টর দেখা যায়ঃ ১) পরিপূর্ণ মানুষের পেছন দিকে ঘোড়ার পেছনের অংশ, লেজ আর দুটো পা জোড়া লেগে এই ধরণের সেন্টরের উৎপত্তি ঘটে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সামনের দিকে মানুষের পা-ই থাকে, ঘোড়ার নয়। নীচের প্রাচীন মূর্তিটি দেখুনঃ

২) একটা ঘোড়ার গলার অংশ থেকে মানুষের দেহ শুরু হয়। নীচের ছবিটি দেখুন (এটি John La Farge কর্তৃক অঙ্কিত এবং ব্রুকলিন জাদুঘরে সংরক্ষিত)

মজার ব্যাপার হল, গ্রীসের পার্থে‌ননের দেয়ালে সর্বপ্রথম দ্বিতীয় ধরণটি প্রকাশিত হয় বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। পার্থে‌ননের মূর্তির আগে সেন্টরদের এই ধরণের আকৃতি প্রচলিত ছিল না। তাই পার্থে‌ননের ভাস্কর ফিডিয়াসই সর্বপ্রথম এই ধরণকে জনসম্মুখে আনেন বলে মত আছে।

 

ইতিহাসে সেন্টররা যে কারণে সবচেয়ে কুখ্যাত, আলোচিত এবং স্মরণীয় হয়ে আছে তা হল, ল্যাপিথদের সাথে তাদের যুদ্ধ। এই যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল সেন্টরদের জগদ্বিখ্যাত বেহায়াপনার জন্য। ল্যাপিথি গোত্রের রাজা পিরিথসের (যে নিজেও এক্সাইয়নের পুত্র ছিল) বিয়ে উপলক্ষ্যে ভোজসভায় এসে সেন্টররা পিরিথসের স্ত্রী হিপ্পোড্যামিয়াকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। শুধু তাই নয়, বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ল্যাপিথ গোত্রের সকল মেয়েকেই তারা অপহরণের চেষ্টা করছিলো। আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলছি।

সেন্টরদের মধ্যে সবচেয়ে উগ্র আর হিংস্র ছিল ইউরিটুস (Eurytus)। পেটে কালা পানি পড়ায় আর অত্যন্ত সুন্দর হিপ্পোড্যামিয়াকে দেখে ইউরিটুস নিজের কামুকতা সামলে রাখতে পারে নি। এক ছুটে গিয়ে হিপ্পোড্যামিয়াকে পাকড়াও করে দৌড় দেয়। আর ইউরিটুসের কাজ কারবার দেখে বাকী সেন্টররাও সাহস পেয়ে যে যেভাবে পারে, ল্যাপিথ নারীদের ধরে নিয়ে যেতে শুরু করে। এরপরই শুরু হয় যুদ্ধ। ল্যাপিথরা ভোজসভায়ই কিছু সেন্টরের মুণ্ডুচ্ছেদ করে, বাকীদের যুদ্ধের মাধ্যমে ল্যাপিথি অঞ্চল থেকে তাড়ানো হয়। প্রাচীন এবং মধ্যযুগের শিল্পকলায় সেন্টরদের এই যুদ্ধ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গ্রীসের পার্থে‌ননে ভাস্কর ফিডিয়াস অত্যন্ত নিপুণভাবে এই যুদ্ধের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন। এর মধ্যে কিছু কালের পরিক্রমায় ধ্বংস হয়ে গেছে, কিছু টিকে আছে। টিকে থাকাগুলোর মধ্যে নীচের ভাস্কর্যটি দেখুনঃ

ইতালীয় ভাস্কর মিকেলেঞ্জেলোও নির্মাণ করেছেন সেন্টর-ল্যাপিথ যুদ্ধের ভাস্কর্য।

 

যদিও একেবারে প্রথম দিককার গ্রীক পুরাণ বা শিল্পকলায় নারী সেন্টরের (যাদেরকে বলা হয় কেন্টোরাইডস) দেখা পাওয়া যায় না, কিন্তু পরবর্তীতে এদের বিষয়ে কিছু কিছু পৌরাণিক কাহিনী শোনা গেছে, এবং চিত্রেও এদেরকে দেখা গেছে। এরা ছিল সেন্টরদের বোন এবং স্ত্রী। সেন্টরদের সাথে পেলিওন পর্বতে থাকতো তারা, লালন পালন করত সন্তানদের।

দ্বিতীয় শতাব্দীর রোমান মোজাইক চিত্রশিল্পে দেখা যাচ্ছে, দুজন নারী সেন্টর দেবী ভেনাসের দুই পাশে দাঁড়িয়ে

তবে কেন্টোরাইডসদের মধ্যে বিশেষভাবে বলা যায় হিলোনোম নামক এক একজনের কথা, যে পিরিথসের বিয়েতে উপস্থিত ছিল। তার স্বামী সিলারুস উক্ত যুদ্ধে নিহত হলে হিলোনোমও আত্মহত্যা করে।

খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর পূর্বের মোজাইক শিল্পে দেখা যাচ্ছে একজন নারী সেন্টরকে

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ 

লেখা পড়ে মনে হতে পারে, সেন্টররা বুঝি শুধু খারাপই হয়। কিন্তু না, ওদের মধ্যেও কালে ভদ্রে একজন/দুজন ভালো অশ্বমানব দেখা গিয়েছিলো। যেমনঃ কাইরন এবং ফোলোস। তবে সেন্টরদের মধ্যে ইউরিটুসের পাশাপাশি নেসুস নামের একজনও কুখ্যাত হয়ে আছে। এই সেন্টর হেরাক্লিসের (যাকে আমরা হারকিউলিস নামে চিনি) স্ত্রীর প্রতি কুনজর দিয়েছিলো! আজ নোট অনেক বড় হয়ে গেছে বলে আলাদাভাবে ভালো এবং খারাপ সেন্টরদের বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দিচ্ছি না। আগামী কোনো নোটে উপস্থাপন করব কাইরন, ফোলোস আর নেসুসের কাহিনী।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া

http://www.greekmyths-greekmythology.com/centaurs/

http://www.theoi.com/

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post খোঁজাখুঁজি সিরিজঃ ইউনিকর্ন
Next post খোঁজাখুঁজি সিরিজঃ বিখ্যাত এবং কুখ্যাত কিছু সেন্টর