প্রথম লেখায় দিয়েছিলাম গ্রিক এবং রোমান মিথলজির “আধেক ঘোড়া আধেক মানুষ”রূপী সেন্টরের বর্ণনা। ওই লেখা পড়ে মনে হতে পারে, সেন্টররা বুঝি শুধু খারাপই হয়। কিন্তু না, ওদের মধ্যেও কালে ভদ্রে একজন/দুজন ভালো অশ্বমানব দেখা যায়। যেমনঃ কাইরন এবং ফোলোস। তবে সেন্টরদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত বোধহয় ইউরিটুস এবং নেসুস! চলুন আজকের প্রথম পর্বে গল্প করি পুরাণের পাতায় বিখ্যাত এবং কুখ্যাত হয়ে থাকা চারজন সেন্টরকে নিয়ে।
সবচেয়ে বিখ্যাত সেন্টর সম্ভবত কাইরন (Chiron)। তাকে বলা হয় সেন্টর গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ সদস্য। বেশিরভাগ সেন্টর যেখানে বন্য, হিংস্র এবং অসভ্য জীবন যাপন করত, সেখানে তিনি ছিলেন ধীর স্থির, বুদ্ধিমান এবং ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। তবে আজকের পর্বে কাইরন থাকছেন না। তার গল্প এতো বিস্তৃত যে, লেখা শুরু করলে অন্য সেন্টররা পাত্তাই পাবে না। তাই পরবর্তী পর্বের জন্য কাইরনকে উঠিয়ে রেখে আজ বলছি ফোলোস, সিলারুস, হিলোনোম, এবং ইউরিটুসের কথা।
![]()
ফোলোস ছিল গ্রিক পুরাণের একজন জ্ঞানী সেন্টর। সে ছিল সাইলেনাস এবং একজন মেলিয়ের ছেলে। ash tree নামক গুল্মের উপদেবীদের সাধারণভাবে Meliae নামে ডাকা হয়। ক্রোনাস যখন ইউরেনাসের লিঙ্গ কেটে ফেলেছিল, তখন ঝরে পড়া রক্ত থেকে মেলিয়েদের জন্ম হয়। যেহেতু অন্যান্য সেন্টরের মতো ফোলোসের বাবা মা এক্সাইয়ন এবং ন্যাফেলি নন, তাই সহজেই বুঝা যায়, ফোলোস অন্য সেন্টরদের তুলনায় কিছুটা হলেও আলাদা। বেশ কিছু প্রাচীন পেইন্টিংয়ে ফোলোসের শারীরিক গঠনেও কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেছে। অন্য সেন্টরদের যেমন পেট থেকে ঘোড়ার দেহ শুরু হয়েছে, ফোলোসের বেলায় সেরকম নয়। ফোলোসের সামনের পা দুটো মানুষের পা-ই ছিল, শুধু নিতম্বের সাথে জোড়া দেওয়া ছিল ঘোড়ার দেহের পেছনের অংশ (দুটো পা এবং লেজ)। তবে ফোলোসের শারীরিক গঠন যে এরকমই ছিল, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ফোলোস থাকতো পেলিওন পর্বতের এক গুহায়। তার সাথে হেরাক্লিসের সখ্যতা নিয়ে বেশ কিছু কাহিনী প্রচলিত আছে। যেমনঃ হেরাক্লিস মাঝে মাঝেই ফোলোসের গুহায় বেড়াতে আসত। একবার যখন হেরাক্লিস বেড়াতে এলো, ফোলোস বন্ধুর সম্মানে এক বোতল ওয়াইন খুলল। কিন্তু বিধি বাম! মদের গন্ধ পেয়ে আশেপাশে থাকা সেন্টরের দল পাগলের মতো গুহার দিকে ছুটে এলো। তবে বেশীরভাগই হেরাক্লিসের হাতে মারা পড়লো। বাকিরা ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে গেলো আরেক জায়গায়।

যখন গুহার বাইরে হেরাক্লিসের সাথে সেন্টরদের চরম লড়াই চলছে, তখন গুহার ভেতর ফোলোস অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে ভাবছিল, কীভাবে ছোট্ট একটা তীর আস্ত একটা সেন্টরকে মেরে ফেলতে পারছে? মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করার সময় হঠাৎ বিষমাখা তীরটা সে দুর্ঘটনাবশত নিজের পায়ের উপর ফেলে দেয়। এতে করে সেখানেই ফোলোস মারা যায়। পরে হেরাক্লিস তার মৃতদেহ আবিষ্কার করে। অন্য এক কাহিনীতে দেখা যায়, গুহার ভেতর ফোলোস মৃত সেন্টরদের দেহগুলো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য জড়ো করছিলো। এমন সময় একটা বিষমাখা তীর কোনোভাবে তার দেহে বিদ্ধ হয়। ফলে ফোলোসের মৃত্যু ঘটে। ফোলোসের মৃত্যুর পর দেবতারা তার দয়ালু মনোভাবের জন্য তাঁকে সেন্টোরাস নক্ষত্রপুঞ্জে স্থান দেন। দান্তের “দা ডিভাইন কমেডি” গ্রন্থে দেখা যায়, অন্যান্য সেন্টরের সাথে ফোলোসও নরকের সপ্তম চক্রে অবস্থিত ফ্লেগেথন নদীর তীর পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে।
![]()
সিলারুস এবং হিলোনোম ছিল স্বামী স্ত্রী। সুদর্শন বীর যোদ্ধা সিলারুস তার স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো। দুজন সবসময় একসাথে থাকতো। সে হিসেবে ল্যাপিথ রাজার বিয়েতেও দুজন একসাথেই গিয়েছিলো। যখন সেন্টরদের সাথে ল্যাপিথদের যুদ্ধ শুরু হয়, স্বামী স্ত্রী পাশাপাশি লড়তে থাকে। একসময় একটা বর্শা এসে আঘাত করে সিলারুসের কাঁধে। মুমূর্ষু সিলারুসের ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে হিলোনোম চেষ্টা করছিলো সিলারুসের প্রাণবায়ু আটকাতে। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় স্ত্রীর বাহুডোরে আবদ্ধ হয়েই সিলারুস মারা যায়। এতে হিলোনোম এতোটাই কষ্ট পায় যে, ঐখানেই আত্মহত্যা করে। যে বর্শাটা সিলারুসকে মেরেছে, ঐ একই বর্শার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হিলোনোম প্রাণ দেয়। আর মারা যাবার সময়ও সে তার প্রিয়তমর হাত ধরে রেখেছিলো।

![]()
ল্যাপিথ রাজার বিয়েতে উপস্থিত সবচেয়ে উগ্র আর হিংস্র সেন্টর ছিল ইউরিটুস। এই সেন্টরের কারণেই ল্যাপিথদের সাথে সেন্টরদের বিখ্যাত যুদ্ধটা লেগেছিল। সেন্টররা এমনিতেই মদখোর হিসেবে পরিচিত। অল্প খেলেই মাতলামো করার কিংবা মদের গন্ধ পেলেই হৈহল্লা লাগিয়ে দেওয়ার কুখ্যাতি তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সেই সেন্টররা বিয়ের ভোজে গিয়ে মদ খেয়ে ঝামেলা না বাঁধালে মানায়? তাই পেটে কালা পানি পড়ায় আর অত্যন্ত সুন্দর হিপ্পোড্যামিয়াকে দেখে ইউরিটুস নিজেকে সামলে রাখতে পারে নি। এক ছুটে গিয়ে হিপ্পোড্যামিয়াকে পাকড়াও করে দৌড় দেয়। আর ইউরিটুসের কাজ কারবার দেখে বাকী সেন্টররাও সাহস পেয়ে যে যেভাবে পারে, ল্যাপিথ নারীদের ধরে নিয়ে যেতে শুরু করে। এরপরই শুরু হয় কালোত্তীর্ণ সেই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ইউরিটুসকে হত্যা করেছিলো থেসেউস।
তথ্যসূত্রঃ
উইকিপিডিয়া
http://www.latein-pagina.de/ovid/ovid_m12.htm#inhalt