0 0
Read Time6 Minute, 51 Second
প্রকাশকালঃ ২০১১, অন্যপ্রকাশ
.
বইটা পড়তে গিয়ে একটা কথাই বার বার মনে হয়েছে – রসকষহীন সমাজ বইয়ের ইতিহাস অংশটুকু হুমায়ূন আহমেদকে দিয়ে লেখালে হতো! তাহলে আর শিক্ষকের বকা খাওয়ার ভয়ে নয়, স্বেচ্ছায়ই সমাজ বইয়ে আমরা মুখ গুঁজে থাকতাম। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতাম সেন বংশ, মৌর্য বংশের ইতিহাস, মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার। মুহূর্তে মাথায় গেঁথে যেতো ব্রিটিশ শাসন, বঙ্গভঙ্গ রদ। তবে এই চিন্তাটা আমার এবারই প্রথম আসেনি। যখনই আমি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্পের বই পড়েছি, তখনই ইতিহাস বইয়ে পড়া তথ্যের চেয়ে মুক্তিযুদ্ধকে অনেক গভীরভাবে অনুভব করেছি। এজন্য আমি চাই যেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও শ্রেণি ভেদে (একদম প্রথম শ্রেণির বাচ্চারা নিশ্চয় দশম শ্রেণির বাচ্চাদের মতো পরিপক্ক নয়!) সহজ ভাষায় বর্ণনা করা হয়। ছোট ছোট ঘটনাগুলো দিয়ে বইয়ের চ্যাপ্টার সাজালে শিশু থেকে শুরু করে টিনেজাররাও যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে পড়বে। আর এই আকালের যুগে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সচেতন প্রজন্মের সংখ্যা ক্রমশ কমছে, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটা পদক্ষেপ হতে পারে, গল্প-উপন্যাসের মতো করে পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস সংযোজন।
.
যাক, বলছিলাম “বাদশাহ নামদার”-এর কথা। বইটি হুমায়ূন আহমেদের মিতা মুঘল সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে রচিত। জানি না অন্য পাঠকদের কী মনে হয়েছে, তবে আমার কাছে হুমায়ূন বাদশার অধিকাংশ কার্যকলাপই স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদ, কিংবা তার সৃষ্ট খামখেয়ালি চরিত্রগুলোর কার্যকলাপের মতো মনে হয়েছে। বন্ধু আরমানের মতে, “আকবর দা গ্রেট টিভি শো দেখে আমি ভাবতাম, হুমায়ূন খুবই দুর্বল একজন সম্রাট। কিন্তু এই বই পড়ে আমার ধারণা পাল্টেছে।” আমারও একই মত। আমিও হুমায়ূন মীর্জাকে দুর্বল শাসক হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। তাই এই বই পড়তে খুব একটা আগ্রহ জন্মায়নি। মানুষ বীরদের কথা শুনতে পছন্দ করে, হারুদের না। কিন্তু এক বন্ধুর রিভিউ পড়ে মনে হল, একবার অন্তত অ্যাটেম্পট নেওয়া দরকার। হাজার হোক, হুমায়ূন আহমেদের লেখা। উনার লেখার কারিশমার সাথে আমি ছোটবেলা থেকে পরিচিত।
.
যেই ভাবা, সেই কাজ। ২২২ পৃষ্ঠার বইটা নিয়ে বসলাম। যেহেতু ইতিহাস বিষয়ক বই, শেষ করতে না জানি কতবার হাই তুলতে হয়! তবে কিনা বড় বড় হরফ দিয়ে এতগুলো পৃষ্ঠা বানানো হয়েছে। ছোট হরফে ছাপা হলে আরও চিকন বই হতো, দামও নিশ্চয় কম পড়তো। ভূমিকায় লেখক বলেছেন, “সম্রাট হুমায়ূন বহু বর্ণের মানুষ। তাঁর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে আলাদা গল্প তৈরি করতে হয়নি। নাটকীয় সব ঘটনায় তাঁর জীবন পূর্ণ।” কথাটা যে কী পরিমাণে সত্যি, সেটা বইয়ের তেরো নাম্বার পৃষ্ঠা পর্যন্ত আসলেই পাঠক বুঝে যায়। আর সেই সাথে লেখকের যাদুকরী ভঙ্গিমা তো আছেই, সাধারণ ঘটনাকে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করতে যার জুড়ি নেই।
.
একবার পড়া শুরু করলে আর উঠাউঠির বালাই থাকবে না। কেন চরম পিতাভক্ত হুমায়ূন তার পিতার সাথে এমন খেয়ালি আচরণ করেন? কেনই বা “ন্যাড়া একবার বেলতলায় যায়” প্রবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি বারবার শত্রুকে ক্ষমা করে দেন? কেন তাকে পালিয়ে বেড়াতে হয় শের খাঁর কাছ থেকে? কেমন রোমান্টিক ছিলেন মুঘল এই বাদশাহ? কেমন ছিল তাঁর পিতৃত্ব? কীভাবে এই খেয়ালি বাদশাহ রাজ্য শাসন করতেন? কীভাবে তাঁর মধ্যে প্রস্ফুটিত হল অসাধারণ কবি ভাব?
.
পুরো বইয়ে তিন চার লাইনের অনেকগুলো শের আছে। শুধু হুমায়ূনের লেখা নয়, বরং সম্রাট বাবর, শের খাঁ, হুমায়ূনের ছোট ভাই কামরান মীর্জার শেরও উল্লেখ করা হয়েছে। বাড়িয়ে বলছি না, সবগুলো শেরই এতো চমৎকার যে, একাধিকবার পড়বেন। বইটিতে অনেকগুলো পার্শ্ব-চরিত্রের সমাহার ঘটেছে। এর মধ্যে প্রধান হলেন বৈরাম খাঁ, কামরান মীর্জা, শের খাঁ। ব্যক্তিগতভাবে বৈরাম খাঁকে আমার খুবই ভালো লেগেছে। কিন্তু আফসোস! এতো বিচক্ষণ হওয়া সত্ত্বেও কী করুণ পরিণতিই না তাকে বহন করতে হল। এছাড়া হামিদা বানুর শক্ত চরিত্র, কিংবা ইসলাম শাহের রসিকতাও আমাকে মুগ্ধ করেছে। খুশি হয়েছি আচার্য হরিশংকরের পরিণতিতে। বইটার প্রতি পৃষ্ঠায় আছে কিছু না কিছু চমক। উদাহরণ হিসেবে আমি যদি একটা কাহিনিও উল্লেখ করি, তবুও আপনি বঞ্চিত হবেন মজার কোনো অনুভূতি থেকে। তাই শুধু আমার অনুভূতিটুকুই লিখলাম।
.
হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, বইটা লেখার জন্য তাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে। কিন্তু নিজেকে গবেষক-লেখক প্রমাণ করতে চান না বলে বইয়ের পেছনে কোনো নির্ঘণ্ট যোগ করেননি। তবে কাহিনির মাঝে টুকটাক উৎসের উল্লেখ করেছেন। তাই কেউ যদি সবগুলো ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে চান, লেখকের মতোই প্রচুর খাটতে হবে। হয়তো লিখেও ফেলতে পারবেন আরেকটা হুমায়ূন নামা!
Happy
Happy
100 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post সিলেট ভ্রমণ (মাধবপুর লেক, বিছনাকান্দি, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান)
Next post বই নিয়ে পর্যালোচনাঃ জননী (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)