1 0
Read Time7 Minute, 52 Second
কী পড়েছিঃ অলাতচক্র
লেখকঃ তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
জনরাঃ হরর
প্রকাশকালঃ ২০০৩
প্রকাশকঃ মিত্র এন্ড ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা।
.
অলাতচক্র নামে আহমদ ছফারও একটি উপন্যাস আছে। তাই দুটোর মধ্যে গোলমাল লাগার সম্ভাবনাও আছে। কিন্তু ছফার উপন্যাসের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারাদাসেরটা যেখানে ব্যাখ্যার অতীত কিছু নিয়ে আলোচনা করে, ছফার বইটা সেখানে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত। তবে আজ আমি একই নামের দুটো বই নিয়ে নয়, বরং তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পের ব্যাপারে পাঠকদের জানাতে এসেছি, যেটা তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রন্থিত করেছেন তার ‘অলাতচক্র’ নামক উপন্যাসতে।
.
বাংলা সাহিত্যে ভৌতিক, আধিভৌতিক ঘরানার গল্প কম হয়নি। তবে শার্লক হোমসের মত হরর জনরায়ও যে একজন ব্যক্তিকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটা কাহিনী থাকতে পারে, সেটা প্রথম জেনেছিলাম সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট ‘তারিণীখুড়োর কীর্তিকলাপ’ পড়ে। সেটা ছিল হাস্যরস মিশ্রিত সহজ সরল হরর কাহিনী। কিন্তু যখন তারানাথ তান্ত্রিক পড়লাম, বুঝলাম তারিণী খুড়োর চেয়ে ইনার কাহিনী অনেক ভিন্ন। তারানাথের কাহিনী গম্ভীর, কিন্তু প্রয়োজনীয় রসে পূর্ণ। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কেন এই জনরায় আমি মিসির আলীকে ফেললাম না? ফেললাম না কারণ মিসির আলী বলেছেন, তিনি অলৌকিক জিনিসকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান। অথচ তারানাথ ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি যেসব জিনিস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন, সেগুলোর ব্যাখ্যা হয় না।
.
যা হোক, মূল আলোচনায় যাবার আগে তারানাথ তান্ত্রিকের পরিচয়টা দিয়ে নিই। ‘পথের পাঁচালী’ কিংবা ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের সুবাদে বাঙালির মুখে মুখে ঘুরা একটি জনপ্রিয় নাম হল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাকে নিয়ে আমরা মাতামাতি করি পল্লী জীবনের অসাধারণ পোর্টরেট তিনি লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন বলে। কিন্তু অনেকে হয়ত জানেন না, বিভূতিভূষণ ভৌতিক গল্পও লিখেছেন। তার সৃষ্ট চরিত্র ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ বাংলা হরর সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত একটি চরিত্র। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারানাথকে নিয়ে তিনি মাত্র দুটো ছোট গল্প লিখে যেতে পেরেছিলেন। সেই দুটো গল্পে এই চরিত্রটি এতই বৈচিত্র্যময় ছিল যে, অনায়াসে তাকে নিয়ে আরও অনেক গল্প ফাঁদা যেত। ব্যাপারটা বাবার মৃত্যুর পর পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও অনুভব করেছিলেন। তাই বাবার সৃষ্ট তারানাথকে নিয়ে তিনি সৃষ্টি করলেন তার অমর উপন্যাস অলাতচক্র।
.
অলাতচক্রে বর্ণনা করা হয়েছে তন্ত্র, মন্ত্রকে; যার মাধ্যমে ডেকে আনা যায় ডাকিনী, যোগিনীকে। এজন্যেই মূল চরিত্র হিসেবে আমরা পাই তারানাথকে, যিনি নেশায় তান্ত্রিক। কিন্তু পেশায়? পেশায় তিনি মধ্যবয়সে এসে হয়েছেন গণনাকারী, যদিও যৌবনে ছিলেন ভবঘুরে। সংসারের প্রতি বিরাগ থেকে অল্প বয়সেই তারানাথ বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। পরে তন্ত্রমন্ত্র শেখার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় ঘুরেছেন বহু জায়গায়, খুঁজেছেন আদর্শ গুরু। কিন্তু এখনকার মত তখনও ছিল ভণ্ড পীর, ফকির, সাধকের ছড়াছড়ি। এর মধ্যেই খুঁজে তারানাথ দীক্ষা নিয়েছিলেন প্রকৃত তান্ত্রিকদের কাছে। যদিও পুরোপুরি সিদ্ধ তান্ত্রিক যাকে বলে, সেটা তিনি হতে পারেননি, কিন্তু সারাজীবন মনে রাখার মত বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। উনার জীবন কাহিনী পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, আধা তান্ত্রিকেরই যদি এই অভিজ্ঞতা হয়, তাহলে পুরো তান্ত্রিকের কেচ্ছা কেমন হতে পারে?
.
বাংলা ভাষায় তন্ত্র মন্ত্রের উপর এত বিস্তারিত বর্ণনা পড়িনি আর কোনো বইয়ে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘প্রেত’ বইটি কালো জাদুর ব্যাপারে বর্ণনা দিয়েছিলো বটে, অনেক ভৌতিক ছোট গল্প তন্ত্রমন্ত্রকে ছুঁয়ে গেছে বটে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলের তন্ত্রমন্ত্রের মূল স্বাদ পেয়েছি তারানাথ তান্ত্রিকের বই পড়েই। এখানে তারানাথ যাই বলেন, তাই যে শ্রোতারা বিশ্বাস করে বসেন, এমনটা নয়। আধুনিক যুগে আমরা যেমন জানি তন্ত্রমন্ত্র ভুয়া, আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগের কলকাতাবাসীদের মধ্যেও তেমন কেউ কেউ ভাবতেন, তন্ত্রমন্ত্র ভুয়া। কিন্তু তারানাথের সব গল্প যে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়! বিশেষ করে, শ্রোতাদের মধ্যে একজন যখন চাক্ষুষ করেন একই ধরনের ঘটনা, আমরা বোকা বনে যাই। এমন কিছু একটা এই যুগে ঘটলে বেশ মৌজ হতো, কী বলেন?
.
বইটি পড়তে আমার একটুকু বিরক্তি লাগেনি কারণ এটা শুধু ভৌতিক আবহ তৈরিতে ব্যস্ত ছিল না। গ্রাম বাংলার যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গ্রাম্য মানুষের যে কোমলতা, সেটাও লেখক দারুণ সাবলীলতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ পড়তে গিয়ে আমি যে স্বপ্নালু গ্রামের ভেতর ডুবে গিয়েছিলাম, সেরকমই অনুভূতি পেলাম এই বই পড়তে গিয়ে। তবে বইটিতে আপনি প্রত্যন্ত হিন্দু গ্রাম থেকে কলকাতা শহরের মট লেন, আবার মট লেন থেকে আদিবাসীদের জঙ্গলে ঘেরা গ্রামে যাওয়া আসা করতে থাকবেন। ফলে ভিন্ন স্বাদের পরিবেশ আপনাকে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেবে। সেই সাথে বইয়ের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা জীবন দর্শন আপনাকে ভাবাবে বৈকি!
.
শেষমেশ, অপেক্ষায় আছি তারানাথ তান্ত্রিকের উপর লেখা তারাদাসের আরেকটি বই ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ পড়ার। আশা করি, অলাতচক্রের মত দারুণ কিছু সময় কাটবে।
Happy
Happy
50 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
50 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
Previous post বই নিয়ে পর্যালোচনাঃ জননী (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)
Next post বই নিয়ে আলোচনাঃ নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (শংকর)